এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি তেলের মজুদ বাড়াতে সহায়তা করবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। জরুরি পরিস্থিতিতে দেশগুলোয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি তেল সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ অঞ্চলের আমদানিনির্ভর দেশগুলোয় জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি কমাতেই এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
জাপানের নেতৃত্বাধীন ১১ দেশের জোট এশিয়ান জিরো এমিশন কমিউনিটির (এজেডইসি) মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক ৮ অক্টোবর ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে সৌদি আরব ও ইউএইর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে এশিয়ার দেশগুলোর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুদ বাড়াতে সহযোগিতার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে দেশ দুটি।
বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে প্রায় ৭০টি নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এজেডইসির আওতায় জ্বালানি খাতের প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬০০ হয়েছে। এসব প্রকল্পে জ্বালানি তেলের মজুদ, পারমাণবিক বিদ্যুৎ, অ্যামোনিয়া ও জৈব জ্বালানি-সংক্রান্ত উদ্যোগ রয়েছে। এবারই প্রথম সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের সঙ্গে এজেডইসির মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহনে বিঘ্নের কারণে এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলো সরবরাহ সংকটের ঝুঁকিতে পড়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। এতে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়ে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় এশিয়ার দেশগুলোয় জ্বালানি তেলের মজুদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যাতে সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যাহত হলেও সংরক্ষিত তেল সরবরাহ করে সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব হয়। এতে সৌদি আরব ও ইউএইও বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার সুবিধা পেতে পারে। তবে মজুদ কেন্দ্রের অবস্থান, পরিচালনা ও সরবরাহের শর্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এছাড়া আজ সৌদি আরবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ফোরামের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তেল উত্তোলনকারী ও আমদানিকারক দেশগুলোর মন্ত্রী পর্যায়ের এ আলোচনায় জাপানের অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। সেখানে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতার কাঠামো তুলে ধরতে পারে দেশটি।
জাপান-ফিলিপাইন সহযোগিতা: জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা ও ফিলিপাইনের জ্বালানি বিভাগ ৮ অক্টোবর তেল নিরাপত্তা জোরদারে একটি যৌথ বিবৃতিতে সই করেছে। এর আওতায় ফিলিপাইনের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিশ্লেষণ, মজুদনীতি প্রণয়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করা হবে। এক্ষেত্রে জাপান নিজেদের অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নেবে।
জাপান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তেল সংরক্ষণের জন্য সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিকে ট্যাংক ভাড়া দেয়। এসব ট্যাংকে রাখা জ্বালানি তেল জরুরি পরিস্থিতিতে কেনার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায় জাপান। এ ব্যবস্থাকে এশিয়ার অন্য দেশগুলোর জন্যও উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া গত এপ্রিলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ‘পাওয়ার এশিয়া’ নামে একটি জ্বালানি সহযোগিতা পরিকল্পনার প্রস্তাব দেন। এ পরিকল্পনায় ১ হাজার কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তার কথা রয়েছে।
ফিলিপাইন ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ নিজস্ব জ্বালানি তেলের মজুদ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। দেশটিতে আঞ্চলিক জ্বালানি মজুদ কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে।
এশিয়ার দেশগুলোর মজুদে বড় ব্যবধান: সত্তর দশকের তেল সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে জাপান শক্তিশালী মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দেশটির মজুদকৃত জ্বালানি তেল দিয়ে ২০০ দিনের বেশি চাহিদা মেটানো সম্ভব। তবে এশিয়ার অনেক দেশের মজুদ এর তুলনায় কম।
জাপানের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জ্বালানি সংস্থার তথ্যানুযায়ী, গত মার্চে থাইল্যান্ডের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির সম্মিলিত মজুদ ছিল ৬১ দিনের চাহিদার সমান। ফিলিপাইনের মজুদ ছিল ৫৩ দিনের। আর ভিয়েতনামের মজুদ দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল মাত্র ৩০ দিনের।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর কয়েকটি এশীয় দেশ জ্বালানির ব্যবহার সীমিত করতে বাধ্য হয়। এতে বোঝা যায়, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ সংকট মোকাবেলায় দেশগুলোর মজুদ বাড়ানো কতটা জরুরি।
এদিকে জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে এশিয়ার দেশগুলো। আসিয়ান অঞ্চলে মোট প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৩০ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় এর অংশ ৪৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড উন্নয়নেও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।