সৌদি আরবে বাড়ছে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন। বাড়তি এ গ্যাস কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে নতুন সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখছে দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো। একই সঙ্গে গ্যাস থেকে বাণিজ্যিকভাবে আয় বাড়ানোর পথও খুঁজছে প্রতিষ্ঠানটি। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
দেশটির জাফুরাহ গ্যাস ক্ষেত্রে উত্তোলন বাড়ায় আগামী কয়েক বছরে গ্যাসের উদ্বৃত্ত তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে গ্যাস রফতানি করা যায় কিনা সেটিও পর্যালোচনা করছে আরামকো। পাশাপাশি নিজেদের গ্যাস ব্যবসা সম্প্রসারণ ও সম্পদ থেকে বাড়তি মুনাফা পাওয়ার বিভিন্ন উপায় খতিয়ে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানিকারক সৌদি আরব এর আগে প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি করেনি। কারণ দেশটির অভ্যন্তরীণ গ্যাসের চাহিদা স্থানীয় উৎপাদনের তুলনায় বেশি ছিল। তবে ১০ হাজার কোটি ডলারের জাফুরাহ প্রকল্প চালুর মাধ্যমে দেশটির গ্যাস খাতে বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।
২০২০ সালে জাফুরাহ প্রকল্পের উন্নয়নকাজ শুরু করে আরামকো। গত বছর সেখানে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়েছে। প্রকল্পটির দ্বিতীয় পর্যায় ২০৩০ সালের মধ্যে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সময়ের মধ্যে ২০২১ সালের তুলনায় আরামকোর সামগ্রিক গ্যাস উত্তোলন প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাড়তি গ্যাসের একটি বড় অংশের জন্য স্থানীয় বাজারও তৈরি হচ্ছে। সৌদি আরব বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ব্যবহার কমিয়ে গ্যাসের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ খাতে তেলের চাহিদা কমবে। ফলে বাড়তি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানির সুযোগ পাবে দেশটি। এতে দেশটির রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
এছাড়া সৌদি আরবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডেটা সেন্টার খাত দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে। এসব খাতেও বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা বাড়বে। তবে দেশীয় চাহিদা বাড়লেও ভবিষ্যতে উত্তোলিত গ্যাসের পুরোটা স্থানীয় বাজারে ব্যবহার করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির হিসাব অনুযায়ী, সৌদি আরবে বছরে প্রায় ১৮ হাজার কোটি ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব। দেশের সব চাহিদা মেটানোর পরও বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি ঘনমিটার গ্যাস উদ্বৃত্ত থাকতে পারে।
উড ম্যাকেঞ্জির গবেষণা পরিচালক নেভান বোরুজেরদি বলেন, ‘উত্তোলন লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছলে আরামকোর গ্যাসের জন্য নতুন বাজারের প্রয়োজন হবে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা পর্যাপ্ত না হলে তখন বিদেশী ক্রেতাদের কাছে গ্যাস বিক্রির পথ খুঁজতে হবে।’
এক্ষেত্রে সৌদি আরব এলএনজি রফতানিকারক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এর জন্য গ্যাস তরলীকরণ ও রফতানি অবকাঠামো নির্মাণে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। জাফুরাহ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের গ্যাস ব্যবহার করে একটি এলএনজি রফতানি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। তবে আপাতত সে পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়েছে। সৌদি সরকার এখন আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
গ্যাস ব্যবসা থেকে বাড়তি মুনাফা পাওয়ার আরেকটি পথও খুঁজছে আরামকো। ‘প্রজেক্ট গামা’ নামে একটি উদ্যোগের আওতায় গ্যাস ব্যবসাকে মূল কোম্পানি থেকে আলাদা করার প্রস্তুতি চলছে। ভবিষ্যতে নতুন এ ব্যবসা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পানি, জমি ও তেল সংরক্ষণ অবকাঠামোর মতো সম্পদ থেকেও বাড়তি মুনাফা পাওয়ার চেষ্টা করছে আরামকো।
সৌদি আরব পর্যটন, বিমান চলাচল, প্রযুক্তি ও এআই খাতে বড় বিনিয়োগ করছে। এসব প্রকল্পে অর্থ জোগাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ থেকে সর্বোচ্চ লভ্যাংশ পাওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে রিয়াদ।
তবে গ্যাস ব্যবসা আলাদা করে শেয়ারবাজারে আনা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক এলএনজি সম্পদ নতুন কোম্পানির আওতায় না থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরবে গ্যাসের দাম সরকার নির্ধারণ করে। ফলে ব্যবসাটি স্থিতিশীল হলেও বিনিয়োগকারীদের কাছে এর আকর্ষণ কতটা হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক সংঘাতও সৌদি আরবের জ্বালানি খাতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কার মধ্যে বড় বিনিয়োগ বা শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও জাফুরাহ থেকে বাড়তে থাকা গ্যাসের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক মূল্য নিশ্চিত করতে বিকল্প খুঁজছে আরামকো।