বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিবর্তনের কারণে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এখন শুধু মুনাফা বা আর্থিক লাভের চেয়ে কৌশলগত জাতীয় অগ্রাধিকারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ তহবিলগুলো। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় এ তহবিলগুলো এখন শক্তিশালী অবকাঠামো নির্মাণ এবং অভ্যন্তরীণ মূল শিল্পগুলোয় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে। খবর রয়টার্স।
স্পেনভিত্তিক আইই ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৫ ট্রিলিয়ন বা ১৫ লাখ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে এ তহবিলগুলো এখন বেশ প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছে। এর মূল কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার এখন এআই ও সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ প্রযুক্তিকে সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক খাত হিসেবে নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে।
গবেষণা প্রতিবেদনের সম্পাদক ও আইই ইউনিভার্সিটির সার্বভৌম তহবিল গবেষণা বিভাগের পরিচালক হাভিয়ের কাপাপে সামগ্রিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বের এ খণ্ডিত অবস্থা বা মেরুকরণ তহবিলগুলোর পরিচালনার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বিভিন্ন দেশের সরকার এখন নিজেদের জাতীয় কৌশল বাস্তবায়নে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় (গ্লোবাল ভ্যালু চেইন) নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে সার্বভৌম তহবিলগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এর অর্থ হলো, এ তহবিলগুলো এখন অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে।’
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, সার্বভৌম তহবিলগুলো এখন ছোটখাটো বিনিয়োগের চেয়ে বড় চুক্তির দিকে বেশি ঝুঁকছে। আগের প্রতিবেদনের তুলনায় সরাসরি বিনিয়োগের সংখ্যা ১৭ শতাংশ কমে ৩৯১টি লেনদেনে নেমে এলেও মোট ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৯১ শতাংশ বেড়েছে। আইই ইউনিভার্সিটির ২০২৪ সালের প্রতিবেদনের তুলনায় এবার মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে। এ থেকে ধারণা করা যায়, তহবিলগুলো এখন আলাদাভাবে ছোট খাতগুলোয় বিনিয়োগ করলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রজেক্ট বা বড় চুক্তিতে অনেক বেশি অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে।
হাভিয়ের কাপাপে জানান, এ গবেষণায় ট্র্যাক বা পর্যবেক্ষণ করা মোট ব্যয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খরচ হয়েছে এআই-সংক্রান্ত বিনিয়োগে। স্টারগেট, ওপেনএআই ও ডেটাব্রিকসের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এ সার্বভৌম বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ পুঁজি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। রাষ্ট্রীয় এ তহবিলগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মানসিকতা নিয়ে কাজ করে। ফলে তাৎক্ষণিক মুনাফা না খুঁজে তারা রিটার্ন বা লাভের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে হওয়া বেশ কয়েকটি বড় চুক্তি এ ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকে প্রমাণ করে। উদাহরণস্বরূপ, আবুধাবিভিত্তিক নতুন তহবিল এমজিএক্স চ্যাটজিপিটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইকে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। এছাড়া ইলোন মাস্কের এআই প্রতিষ্ঠান এক্সএআইতে বিনিয়োগ করেছে এমজিএক্স, কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (কিউআইএ) এবং ওমান ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি। অন্যদিকে কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি ও সিঙ্গাপুরের সরকারি তহবিল জিসিসি যৌথভাবে আরেকটি শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানি অ্যানথ্রোপিকের ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের বিশাল তহবিল সংগ্রহের কাজে অংশগ্রহণ করেছে।
সার্বভৌম তহবিলে বিনিয়োগের সিংহভাগই নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ২২ হাজার ৪০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছে। তবে কাপাপে উল্লেখ করেছেন, গবেষণাটি করা হয়েছে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৮ মাসের সরাসরি বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করে। এটি আসলে মূল চিত্রের একটি ছোট অংশ মাত্র, কারণ সার্বভৌম তহবিলগুলোর একটি বড় অংশের বিনিয়োগের তথ্য গোপন রাখা হয় এবং তা কখনই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না।
জ্বালানি খাতে সমৃদ্ধ দেশগুলো, বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলো এবং নরওয়ে এ সময়ে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয়কারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তেল ও গ্যাস রফতানি থেকে অর্জিত বিপুল আর্থিক রিজার্ভ বা উদ্বৃত্ত তহবিলের কারণে তারা এ বিশাল বিনিয়োগ করতে পেরেছে। অন্যদিকে লেনদেনের সংখ্যার দিক থেকে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রায়ত্ত তহবিল টেমাসেক। আলোচ্য সময়ে তারা এককভাবে মোট ৭১টি আলাদা বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
আইই ইউনিভার্সিটির এ প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে নতুন করে গড়ে ওঠা ১২টি সার্বভৌম তহবিলের কার্যক্রমও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে আবুধাবির এমজিএক্স ছাড়াও আয়ারল্যান্ড, ব্রিটেন, বতসোয়ানা ও স্পেনের মতো দেশগুলোর নতুন রাষ্ট্রীয় তহবিল রয়েছে। কাপাপে বলেন, ‘এ প্রবণতা থেকে স্পষ্ট ধারণা করা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে এবং কৌশলগত ক্ষেত্রগুলো নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় পুঁজি ব্যবহারে আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর আর কোনো সময়েই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা বা বাজারবহির্ভূত বিষয়গুলো এতটা গুরুত্ব পায়নি, এখন যতটা পাচ্ছে। প্রতিবেদনটির উপসংহারে বলা হয়েছে, বিশ্ব এখন একটি সম্পূর্ণ নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং সার্বভৌম তহবিলগুলো এ বৈশ্বিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা যতদিন বজায় থাকবে, রাষ্ট্রায়ত্ত এ তহবিলগুলো ততদিন আর্থিক মুনাফার পাশাপাশি নিজেদের দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও সরবরাহ চেইন সুরক্ষিত রাখাকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করবে।