বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে আইসিএবি সভাপতি

রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সমন্বিত প্রয়াস ও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন প্রয়োজন

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা সংকটের মধ্যেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার।

এতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ‘উচ্চাভিলাষী’ এ লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিত প্রয়াস ও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন হিসাববিদদের সংগঠন দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সভাপতি এনকেএ মবিন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সিএ ভবনে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর হিসাববিদদের ভাবনা জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

এনকেএ মবিন বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সরকার ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি আমাদের একটি সমৃদ্ধ দেশে পৌঁছার যাত্রায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তবে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সমন্বিত প্রয়াস এবং সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকাই ব্যাংক খাত থেকে সংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ঘাটতি অর্থায়নের এ লক্ষ্যমাত্রা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সহজলভ্যতাকে সীমিত এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।’

প্রস্তাবিত বাজেটে আইসিএবির বেশকিছু সুপারিশ প্রতিফলিত হয়েছে জানিয়ে সংগঠনটির সভাপতি বলেন, ‘ন্যূনতম কর, করহার নির্ধারণ, কর ফেরত, স্টার্টআপ কর প্রণোদনা, ট্রাইব্যুনাল ও উচ্চ আদালতে আপিল, কর জমার পরিমাণ হ্রাস এবং নগদ লভ্যাংশ প্রদানের ওপর অতিরিক্ত করের আওতামুক্তি সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ।’ এর ফলে কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যবসা পরিচালনা সহজীকরণ এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও আইসিএবির যৌথ উদ্যোগে চালু হওয়া ডকুমেন্ট ভ্যারিফিকেশন সিস্টেম (ডিভিএস) কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলেও দাবি করেন এনকেএ মবিন।

বাজেটে সরকার আরো কিছু বিষয় বিবেচনা করতে পারে জানিয়ে এ হিসাববিদ বলেন, ‘অনলাইন শুনানি এবং কর নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করতে পারে। তবে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর সংগ্রহে বাধ্য করা হলে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে।’

সংবাদ সম্মেলনে খুচরা পর্যায়ে অগ্রিম কর আহরণের প্রস্তাব বাদ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে আইসিএবির সাবেক সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘নতুন প্রস্তাব অনুসারে স্থানীয় পর্যায়ে সব খুচরা ব্যবসায়ী করের আওতায় আসতে বাধ্য হবেন। তখন খুচরা পর্যায়ে সব নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে।’

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা ক্ষুদ্র ও উদীয়মান ব্যবসার জন্য বাস্তব সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

এ সময় প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন রহমান রহমান হক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের পরিচালক সরকার নাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে অনেক ইতিবাচক দিক থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে নিয়মকানুনের বোঝা রয়ে গেছে। বাজেটে লভ্যাংশ করের হার কমানো হয়নি এবং ব্যক্তিশ্রেণীর কর রেয়াত কমানো হয়েছে। হিসাবের নথিপত্র সংরক্ষণের নিয়মও আরো কঠোর করা হয়েছে। কোম্পানিগুলোর জন্য এ নথি ১২ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে। এছাড়া বিদেশী কর্মীদের কর্মসংস্থান এবং নির্দিষ্ট কিছু লেনদেনের ক্ষেত্রে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এ পদক্ষেপগুলোর কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর পরিপালন খরচ কিছুটা বাড়তে পারে। সার্বিকভাবে বলা যায়, পরিপালন ব্যবস্থার উন্নতি হলেও ব্যবসায়ীদের আরো বেশি তথ্য বা রিপোর্ট জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতায় পড়তে হতে পারে।’

সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন আইসিএবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল, সহসভাপতি মো. মনিরুজ্জামান ও কাউন্সিল সদস্য এমবিএম লুৎফুল হাদী এবং এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া।

আরও