পিআরআইয়ের সেমিনারে বক্তারা

শুল্ক ও প্যারা-ট্যারিফ কাঠামো দেশের রফতানি বহুমুখীকরণে বড় বাধা

চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের অর্ধেকের বেশি কোনো না কোনো ধরনের শুল্ক ছাড় পেয়েছে। এসব ছাড়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকায় নির্ধারিত ও প্রকৃত আদায়কৃত শুল্কের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

দেশে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর নির্ধারিত শুল্কের সঙ্গে সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ বিভিন্ন ধরনের প্যারা-ট্যারিফ যুক্ত হয়ে কার্যকর শুল্কহার অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এ ধরনের শুল্ক কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর এ চাপ আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে, বাণিজ্য নীতির এ কাঠামোগত দুর্বলতায় শিল্প খাতের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে, যা রফতানি বহুমুখীকরণে বড় বাধা। ‘বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতির সন্ধিক্ষণ: জাতীয় শুল্কনীতি, এলডিসি উত্তরণ ও আগামী প্রজন্মের বাণিজ্য চুক্তির প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। রাজধানীর বনানীতে গতকাল বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ নোরা ডিহেল। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে গড় স্বাভাবিক আমদানি শুল্ক (এমএফএন ট্যারিফ) ৭ শতাংশ। এর সঙ্গে সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক যুক্ত হওয়ায় গড় নামমাত্র শুল্কহার দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ২২ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং পণ্যভেদে ৭০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে। এসব শুল্ক কমালে বাংলাদেশ সাময়িকভাবে কিছুটা রাজস্ব হারালেও দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাবে।

শুল্ক অব্যাহতিকেও বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন নোরা ডিহেল। তার উপস্থাপিত তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট আমদানি ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৬১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার আমদানি কোনো শুল্ক ছাড়াই দেশে প্রবেশ করেছে, যা মোট আমদানির ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এছাড়া ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার পণ্য অন্তত ৫০ শতাংশ কাস্টমস শুল্ক অব্যাহতি পেয়েছে, যা মোট আমদানির ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ। চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের অর্ধেকের বেশি কোনো না কোনো ধরনের শুল্ক ছাড় পেয়েছে। এসব ছাড়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকায় নির্ধারিত ও প্রকৃত আদায়কৃত শুল্কের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘শুধু বাণিজ্য নীতি দিয়ে অর্থনীতির পরিবর্তন সম্ভব নয়; এর সঙ্গে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কার জরুরি।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘মুক্ত বাণিজ্য থেকে বড় আয়ের সম্ভাবনা থাকলেও তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। মধ্যবর্তী উপকরণ ও চূড়ান্ত পণ্যের উচ্চ শুল্ক কমানোর পাশাপাশি রাজস্ব প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমিক ও বাস্তবসম্মত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) কৌশল নেয়া প্রয়োজন।’ এ ক্ষেত্রে এসএমই ও অঞ্চলভিত্তিক সমন্বয় ব্যয়ের দিকেও নজর দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বিশ্বজুড়ে সংরক্ষণমূলক বাণিজ্য নীতি জোরদার হচ্ছে। ফলে তাড়াহুড়ো করে শুল্ক কমানোর পরিবর্তে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার করা উচিত।’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে দ্য ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, ‘প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে শুল্ক সংস্কার প্রয়োজনীয় হলেও তা একা যথেষ্ট নয়। বন্ড লাইসেন্সের বিপরীতে তুলা-সুতা আমদানি সীমিত করার সাম্প্রতিক কাস্টমস এসআরওর মতো ঘটনায় নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।’ উৎপাদনশীলতা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো ও অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, ‘শুল্ক কমানোর ফলে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে কর্মসংস্থান কমে বেকারত্ব বাড়তে পারে। তাই পূর্বানুমেয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবসায়িক পরিবেশের পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, গুণমান ও উদ্ভাবনভিত্তিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।’

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন পিআরআই চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার। তিনি বলেন, ‘মধ্যবর্তী পণ্যের শুল্ক কমানোর সঙ্গে উৎপাদিত পণ্যের শুল্কও সমপর্যায়ে কমাতে হবে। তা না হলে তৈরি পোশাকের বাইরের রফতানিতে রফতানিবিরোধী পক্ষপাত বাড়তে পারে।’ বর্তমান শুল্ক কাঠামোয় পূর্ণাঙ্গ এফটিএ কঠিন হওয়ায় অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) তুলনামূলক বাস্তবসম্মত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘দুর্বল দেশীয় মান ব্যবস্থা ও বাণিজ্য অবকাঠামো রফতানি প্রস্তুতিকে সীমিত করছে। সংস্কারের আর্থিক ও রাজনৈতিক সমন্বয় ব্যয়ের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রসমর্থিত শিল্পনীতির পুনরুত্থানও বিবেচনায় নিতে হবে।’

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী শুল্ক সংস্কারের পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার, জ্বালানি, অর্থায়ন, লজিস্টিকস, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণ, অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও গভীরতর এফটিএর পথে অগ্রসর হতে স্পষ্ট ও পূর্বানুমেয় নীতি-অনুক্রম প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও মানব উন্নয়নকে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে রাখতে হবে।’

সমাপনী বক্তব্যে পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশীদ আলম বলেন, ‘শুল্ক সংস্কার প্রয়োজনীয় হলেও এটি একক কোনো সমাধান নয়। ব্যবসা সহজীকরণ, শিক্ষা ও আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোয় উন্নতি ছাড়া সংস্কারের পূর্ণ সুফল মিলবে না।’ তৈরি পোশাকের বাইরের খাতগুলোকে বাণিজ্য কৌশল ও এফটিএ আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

আরও