কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বৈশ্বিক প্রসারে বাড়ছে সংশ্লিষ্ট হার্ডওয়্যারের চাহিদা। এর প্রভাব পড়ছে এশিয়ার শিল্প খাতে। চিপ, কম্পিউটার ও এআই-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পণ্যের চাহিদায় আগস্টে এশিয়ার কয়েকটি বড় অর্থনীতির দেশে কারখানা কার্যক্রম বেড়েছে। চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় শিল্প উৎপাদনে গতি ফিরেছে। খবর রয়টার্স।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধের কারণে এর মধ্যেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এর সঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে বিভিন্ন ধরনের উৎপাদন ব্যয়। ফলে এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্যের চাহিদা শিল্প খাতকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো চ্যালেঞ্জপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
চীনের রেটিংডগ চায়না জেনারেল ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স বা পিএমআই আগস্টে বেড়ে ৫১ দশমিক ৫ পয়েন্টে উঠেছে। জুলাইয়ে এ সূচক ছিল ৫০ দশমিক ৯। পিএমআইয়ের ৫০-এর বেশি মান শিল্প খাতে সম্প্রসারণ ও এর নিচের মান সংকোচন নির্দেশ করে। অর্থাৎ আগস্টে চীনের উৎপাদন খাতে সম্প্রসারণ হয়েছে।
চীনের এ পিএমআই বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে। রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকরা আগস্টের পিএমআই ৫১ পয়েন্ট হবে বলে ধারণা করেছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির শিল্প খাতের কিছু অংশে এআই পণ্যের চাহিদা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করছে। তবে সরকারি জরিপে সামগ্রিক কারখানা কার্যক্রম এখনো সংকোচনের মধ্যে রয়েছে। এতে বোঝা যায়, চীনের অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া এখনো নাজুক।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের চীনবিষয়ক অর্থনীতিবিদ নগুয়েন হোয়াং নাম বলেন, ‘রেটিংডগের উৎপাদন পিএমআইয়ের উন্নতি সরকারি পিএমআইয়ের উন্নতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে আগস্টে শক্তিশালী বৈদেশিক চাহিদার কারণে চীনের কারখানা কার্যক্রমে কিছুটা গতি ফেরার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।’
এদিকে জাপানের শিল্প খাতেও গতি বেড়েছে। আগস্টে দেশটির উৎপাদন খাতে নতুন ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ২০১৮ সালের জানুয়ারির পর সবচেয়ে দ্রুত হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর ও এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্যের শক্তিশালী চাহিদা এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের জাপান ম্যানুফ্যাকচারিং পিএমআই আগস্টে বেড়ে ৫৪ দশমিক ৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ে ছিল ৫৪ দশমিক ৫। এপ্রিলের পর এটিই জাপানের উৎপাদন খাতের সর্বোচ্চ পিএমআই। একই সঙ্গে টানা অষ্টম মাসে দেশটির শিল্প খাতে সম্প্রসারণ হয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী পরিচালক অ্যানাবেল ফিডস বলেন, ‘এআই-সংশ্লিষ্ট খাতের চাহিদা বিবেচনায় জাপানের উৎপাদন খাতের সামনে শক্তিশালী পারফরম্যান্স ধরে রাখার ভালো সুযোগ রয়েছে।’
দক্ষিণ কোরিয়ায়ও টানা নবম মাসে কারখানা কার্যক্রম বেড়েছে। আগস্টে দেশটির পিএমআই অবশ্য জুলাইয়ের তুলনায় কিছুটা কমেছে। জুলাইয়ে এটি ছিল ৫৩ দশমিক ১। আগস্টে তা নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ৩-এ। তার পরও সূচকটি ৫০-এর ওপরে রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প খাতের সম্প্রসারণের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল রফতানি। আগস্টে দেশটির রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। এ নিয়ে দেশটির রফতানি বেড়েছে টানা ১৫ মাস।
এশিয়ার অন্য কয়েকটি দেশেও আগস্টে উৎপাদন খাতে সম্প্রসারণ হয়েছে। তাইওয়ানে পিএমআই ছিল ৫৪ দশমিক ৭, জুলাইয়ে যা ছিল ৫৫ দশমিক ১। মালয়েশিয়ায় পিএমআই জুলাইয়ের ৫০ দশমিক ৭ থেকে কমে আগস্টে ৫০ দশমিক ২ হয়েছে। তার পরও দেশটির শিল্প খাত সম্প্রসারণের মধ্যে রয়েছে।
ফিলিপাইনের উৎপাদন খাতের পরিস্থিতি ছিল আরো শক্তিশালী। দেশটির পিএমআই জুলাইয়ের ৫১ দশমিক ৮ থেকে আগস্টে বেড়ে ৫৪ দশমিক ৯ হয়েছে। এক মাসের ব্যবধানে দেশটির শিল্প খাতে উল্লেখযোগ্য গতি ফিরেছে।
তবে সব দেশে একই চিত্র দেখা যায়নি। ইন্দোনেশিয়ার পিএমআই আগস্টে ৪৯ দশমিক ৮-এ নেমে গেছে। জুলাইয়ে এটি ছিল ৫০ দশমিক ২।
দক্ষিণ এশিয়ার বড় অর্থনীতি ভারতেও শিল্প খাতের গতি কমেছে। দুর্বল চাহিদার কারণে আগস্টে দেশটির কারখানা উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
এর প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানেও। দুই বছরের বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো দেশটির শিল্প খাতে চাকরি কমেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সব মিলিয়ে এশিয়ার উৎপাদন খাতে এখন এআই ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রভাব স্পষ্ট। বিশেষ করে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো রফতানিনির্ভর অর্থনীতিতে এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা কারখানা কার্যক্রমে গতি আনছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্বল ভোক্তা চাহিদার মতো ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে এআই-নির্ভর চাহিদা এশিয়ার শিল্প খাতকে কতটা সময় ধরে শক্তিশালী রাখতে পারে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।