মুন্সিগঞ্জে ১৪ গ্রাহকের ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা নিয়ে উধাও অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তা

ভুক্তভোগী আমানতকারীদের অভিযোগ, টাকা জমা দিতে এলে ক্যাশ অফিসার শরীফুজ্জামান রসিদে স্বাক্ষর ও ব্যাংকের সিল দিয়ে ক্যাশ মেমো দিতেন। তবে সেই টাকা ব্যাংকের মূল ডিজিটাল ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত না করে তিনি আত্মসাৎ করতেন।

অগ্রণী ব্যাংকের মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর শাখার গ্রাহকের হাতে ব্যাংকে টাকা জমা দেয়ার রসিদ থাকলেও ব্যাংক হিসাবে সেই টাকার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। টাকা তুলতে গিয়ে একের পর এক গ্রাহক জানতে পারছেন, তাদের হিসাবে টাকা জমা হয়নি। ১৪টি হিসাবের ২ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন তারা। আর এ কারসাজির অভিযোগ উঠেছে ওই শাখার ক্যাশ অফিসার শরীফুজ্জামান সোহাগের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার পর অভিযুক্ত শরীফুজ্জামান সোহাগ কর্মস্থলে অনুপস্থিত ও পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

শরীফুজ্জামানের অনুপস্থিতি এবং গ্রাহকদের হিসাবে টাকা না থাকার বিষয়টি জানাজানি হলে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর ব্যাংকের বাইরে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের ভিড় বাড়তে থাকে। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে হট্টগোল সৃষ্টি হলে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‍্যাব মোতায়েন করা হয়। এরপর খবর পেয়ে শ্রীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, শ্রীনগর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং অগ্রণী ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

অগ্রণী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুরে এক নারী গ্রাহক ডিপিএস ও এফডিআরের টাকার খোঁজ নিতে ব্যাংকে এলে জালিয়াতির ঘটনা সামনে আসে। পরে অনুসন্ধানে অন্তত ১৪টি হিসাব থেকে মোট ২ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া যায়।

ভুক্তভোগী আমানতকারীদের অভিযোগ, টাকা জমা দিতে এলে ক্যাশ অফিসার শরীফুজ্জামান রসিদে স্বাক্ষর ও ব্যাংকের সিল দিয়ে ক্যাশ মেমো দিতেন। তবে সেই টাকা ব্যাংকের মূল ডিজিটাল ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত না করে তিনি আত্মসাৎ করতেন।

আইভরি কোস্ট-প্রবাসী মো. বাহাদুরের ভগ্নিপতি শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার শ্যালক বাহাদুরের হিসাবে ৮৫ লাখ টাকা জমা ছিল। হিসাব খোলার পর তিনি কোনো চেকবইও তোলেননি। আজ ব্যাংকে এসে দেখি, হিসাবে কোনো টাকাই নেই। প্রতারক কর্মকর্তা ব্যাংকের সিস্টেম থেকে ফোন নম্বর পরিবর্তন করে পুরো টাকা তুলে নেন। এর মধ্যে ৩০ লাখ টাকার চেক ক্যাশ অফিসার শরীফুজ্জামান নিজের নামেই ইস্যু করে তুলে নিয়েছেন।’

অপর ভুক্তভোগী মনিকা বেগম বলেন, ‘আমার জীবনের সমস্ত সঞ্চয় এফডিআর হিসেবে এ ব্যাংকে জমা রেখেছিলাম। এখন এসে শুনছি, ব্যাংকের সিস্টেমে কোনো টাকাই জমা হয়নি। আমানতের টাকা এভাবে হাওয়া হয়ে গেলে আমরা কোথায় যাব!’

অগ্রণী ব্যাংক শ্রীনগর শাখা কর্তৃপক্ষ সূত্রে আরো জানা গেছে, অন্যান্য গ্রাহকদের মধ্যে মনিকা বেগমের ৯ লাখ ৫০ হাজার, তুহিন আক্তারের ৮ লাখ, শিখা আক্তারের ১০ লাখ, নজরুল ইসলামের ১০ লাখ, স্মৃতি আক্তারের ৬ লাখ, পারভীর আক্তারের ৪ লাখ ১০ হাজার, ইসরাতুনের ২ লাখ ৩০ হাজার, যুথী আক্তারের ১ লাখ, রোজিনা বেগমের ২৭ লাখ, নজরুল ইসলামের ৫ লাখ এবং মো. নাছিরের ১৫ লাখ টাকা তাদের হিসাবে জমা হয়নি বা জমা করা অর্থ তুলে নেয়া হয়েছে।

এসব তথ্য নিশ্চিত করে শ্রীনগর শাখার অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, শরীফুজ্জামান গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) থেকে ব্যাংকে অনুপস্থিত থাকায় পরের দিন বুধবার তার ঢাকার আদাবরের বাসায় লোক পাঠানো হয়েছিল। তার স্ত্রী জানিয়েছেন, নারীঘটিত ঝামেলা থাকায় শরীফুজ্জামান বাসা থেকে স্ত্রীর ফোনসহ নিয়ে বেরিয়ে গেছেন।

তিনি আরো জানান, ক্যাশ অফিসার শরীফুজ্জামান সোহাগ এ শাখায় বিগত ৭ বছর যাবত কর্মরত থাকায় অনেকের সঙ্গে তার সখ্যতা তৈরি হয়। শরীফুজ্জামানের বাড়ি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাপোতা এলাকায়। তার বাবার নাম মো. আবুল কালাম।

অগ্রণী ব্যাংক মুন্সিগঞ্জ অঞ্চলের উপ-মহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি প্রধান কার্যালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছি। প্রধান কার্যালয় থেকে উচ্চপর্যায়ের দল আসছে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তের পরেই জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ও জড়িতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা সম্ভব হবে। তবে আমরা গ্রাহকদের আশ্বস্ত করছি, নিয়ম মেনে যাচাই-বাছাই শেষে প্রত্যেক গ্রাহকের বৈধ আমানত ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।’

শ্রীনগর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেন, ‘ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছি আমরা। অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ বা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’

আরও