গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে ইরান। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ক্রমেই দেশটির মুদ্রা ইরানি রিয়ালের অবমূল্যায়ন বাড়ছে, যা কিনা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ করে তুলেছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে সপ্তাহ খানেক ধরে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। কয়েকশ হতাহতের খবর প্রকাশ হয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাই দায়ী নয়, বরং দেশটির অর্থনীতিতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) আধিপত্যও বড় ভূমিকা রাখছে। খবর ইউরো নিউজ।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরানে ইসলামী রীতিনীতি সুরক্ষার জন্য গঠিত হয় আইআরজিসি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাহিনীটি শুধু সামরিক শক্তি নয়, দেশের অর্থনীতিতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবেও গড়ে উঠেছে। নির্মাণ, জ্বালানি, বন্দর, টেলিকম, খনিজ ও জ্বালানি তেল-গ্যাস শিল্পসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতে আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো আধিপত্য বিস্তার করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ইরানে অনেক প্রকল্প প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই বাগিয়ে নেয় আইআরজিসি। এ প্রবণতাই বাহিনীটির নিরাপদ ও লাভজনক আয়ের উৎস নিশ্চিত করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অবস্থা ইরানে একটি দ্বৈত অর্থনীতি তৈরি করেছে। একদিকে আছে সাধারণ নাগরিক ও বেসরকারি খাত, অন্যদিকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থা। সরকারের পক্ষ থেকে স্থিতিশীল রিয়াল-ডলার বিনিময় হার মূলত রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত। ফলে সাধারণ মানুষ বাজারমূল্যেই ডলার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, যা মুদ্রাকে আরো দুর্বল করছে।
১৯৭৯ সালে ১ মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রায় ৭০ ইরানি রিয়াল। চলতি বছরের শুরুতে তা ছাড়িয়ে গেছে ১৪ লাখ ইরানি রিয়ালে। অর্থাৎ গত ৪০ বছরে মুদ্রাটির বিনিময় হার নেমে এসছে ২০ হাজার ভাগের এক ভাগে। দেশজুড়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইআরজিসির অর্থনৈতিক আধিপত্য ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা এ সংকটকে আরো তীব্র করেছে।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবও এক্ষেত্রে কম নয়। ২০২৫ সালে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইরানের বিরুদ্ধে অস্ত্র, পারমাণবিক কর্মসূচি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওই কারণে জটিল ও ব্যয়বহুল পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে দেশটি। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ইরান জ্বালানি তেল রফতানি থেকে প্রায় ২ হাজার ৩২০ কোটি ডলার আয় করেছে, যা সম্ভাব্য আয়ের তুলনায় প্রায় ৫০০ কোটি ডলার কম।
ইরান ওপেন ডাটা প্রজেক্ট নামের সাংবাদিকদের একটি অলাভজনক উদ্যোগ অনুসারে, চীন ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে সরবরাহ বাড়লেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলতে গিয়ে ইরান সম্ভাব্য জ্বালানি তেল রফতানি আয়ের প্রায় ২০ শতাংশ হারাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, জ্বালানি তেলনির্ভরতা ও চলমান নিষেধাজ্ঞার কারণে ‘জিডিপি প্রবৃদ্ধি হারিয়ে ফেলা একটি দশক’ পার করেছে ইরান। ২০১১-২০ সালের মধ্যে মাথাপিছু জিডিপি বছরে দশমিক ৬ শতাংশ হারে সংকুচিত হয়েছে। গত এক দশকে প্রায় এক কোটি ইরানি দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। ২০১১-২০ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী ইরানিদের অনুপাত ২০ থেকে বেড়ে ২৮ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে।
ইরান সরকার একাধিকবার মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে, তবে তা কার্যকর হয়নি। অতি প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য কম বিনিময় হারের ডলার নির্বাচিতদের জন্য সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষকে কালোবাজারে অনেক বেশি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতি আরো বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি আইআরজিসির অর্থনৈতিক প্রভাব কমানো না হয় এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে ইরানের মুদ্রা সংকট ও সামাজিক অস্থিরতা দীর্ঘদিন থাকবে। দেশটির অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।