হরমুজ খুললে ধাক্কা খেতে পারে তেলবাহী জাহাজ খাত

রেকর্ড আয়ের পর পতনের আশঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে কয়েক মাস ধরে অস্বাভাবিক মুনাফা করেছে বিশ্বের তেলবাহী ট্যাংকার খাত।

এখন খাতটির মালিকরা নতুন এক শঙ্কার কথা বলছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সমঝোতায় পৌঁছে হরমুজ প্রণালি ফের পুরোপুরি খুলে দিলে জাহাজ ভাড়ার বাজারে বড় ধরনের পতন ঘটতে পারে। খবর এফটি।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এতে তেল পরিবহনে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে তেলবাহী জাহাজের চাহিদা ও ভাড়া বেড়ে যায়। ফলে জাহাজ মালিকরা রেকর্ড মুনাফা করেন। প্রণালিটি ফের স্বাভাবিকভাবে খুলে গেলে জাহাজ চলাচল সহজ হবে, সরবরাহ বাড়বে ও ভাড়া কমে যেতে পারে। ফলে তেলবাহী জাহাজ খাতের আয় ও মুনাফা কমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শিপিং ব্রোকার প্রতিষ্ঠান ক্লার্কসনের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) তেল ট্যাংকার খাতের মুনাফা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে। এর আগে একক প্রান্তিকে সর্বোচ্চ মুনাফা ছিল ২০২২ সালে ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার।

বাজারের এ উত্থান দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে বলে মনে করছেন অনেক ব্যবসায়ী। কারণ সাম্প্রতিক মুনাফার একটি বড় অংশ নতুন জাহাজ কেনা ও নির্মাণে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে জাহাজের অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হতে পারে।

সামুদ্রিক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এএক্সএস মেরিনের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর বড় আকারের তেলবাহী জাহাজের নতুন অর্ডারের সংখ্যা এরই মধ্যে যেকোনো পূর্ণ বছরের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।

শিপিং কোম্পানি সিএমবি টেকের প্রধান নির্বাহী আলেকজান্ডার স্যাভেরিস বলেন, ‘একসময় বাজারে পতন আসবে এটা নিশ্চিত।’

তার মতে, প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি জাহাজের অর্ডার দেয়া হয়েছে। এর প্রভাব পড়বে ভবিষ্যতে।

যুদ্ধের শুরুর দিকে ট্যাংকার ভাড়া দ্রুত বেড়ে যায়। তখন একটি ট্যাংকার ভাড়া করতে দৈনিক গড়ে ১ লাখ ৬২ হাজার ৯৯২ ডলার পর্যন্ত খরচ হতো। সবচেয়ে বড় জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে দৈনিক ভাড়া পৌঁছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৬৮৫ ডলারে।

হরমুজ প্রণালির কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে ১৬০টির বেশি তেলবাহী জাহাজ আটকে পড়ে। এতে বাজারে জাহাজের সরবরাহ কমে যায় ও বিশ্বজুড়ে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। একই সময়ে লোহিত সাগরে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক জাহাজকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলাচল করতে হয়। এতে যাত্রাপথ দীর্ঘ হয় এবং ভাড়াও বাড়ে।

তবে প্রতিবেদন বলছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ভাড়া কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে বড় জাহাজগুলোর দৈনিক ভাড়া ৫৫-৯৫ হাজার ডলারের মধ্যে রয়েছে। যদিও এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর গড় ৩০-৪০ হাজার ডলারের চেয়ে বেশি। বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালি আবার চালু হতে পারে। এর প্রভাবই ভাড়ার ওপর পড়ছে।

বিশ্বের তেলবাহী জাহাজ খাতে গ্রিক জাহাজ মালিকদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। শিপিং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ভেসন নটিক্যালের তথ্যানুযায়ী, গ্রিক মালিকানাধীন সক্রিয় বহরের মূল্য প্রায় ৬ হাজার ৬৪০ কোটি ডলার। এটি চীনের তুলনায় ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বেশি।

সবাই বাজার নিয়ে সমানভাবে উদ্বিগ্ন নন। কিছু ব্যবসায়ী মনে করেন, নতুন জাহাজের অর্ডার বাড়লেও এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজের ঘাটতি ছিল। তাই বর্তমান বিনিয়োগকে স্বাভাবিক চাহিদার প্রতিক্রিয়া হিসেবেও দেখা যেতে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের রুটে স্থায়ী পরিবর্তন আসতে পারে। এতে ভবিষ্যতেও জাহাজ মালিকরা তুলনামূলক বেশি ভাড়া আদায়ের সুযোগ পাবেন।

আরও