খালি পড়ে আছে বিসিকের শত শত শিল্পপ্লট, বারবার বিজ্ঞপ্তিতেও মিলছে না উদ্যোক্তা

বিসিকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ১৯টি শিল্পনগরী ও শিল্পপার্কের ৯৭৫টি শিল্পপ্লট বরাদ্দের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এ বছর ১৮টি শিল্পনগরী ও শিল্পপার্কে বরাদ্দযোগ্য প্লটের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৬৫টিতে।

শিল্পায়ন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক শিল্পনগরী গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। তবে জমি অধিগ্রহণ, প্লট উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের পরও এসব শিল্পনগরীর বড় অংশে মিলছে না প্রত্যাশিত উদ্যোক্তা। এক বছর আগে বরাদ্দের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া শত শত প্লটের বড় অংশ এখনো খালি। উদ্যোক্তা না পাওয়ায় সেসব প্লটই নতুন করে আবারো বরাদ্দের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিসিক। কোথাও শত শত প্লটের মধ্যে বরাদ্দ হয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি, আবার কোনো কোনো শিল্পনগরীর একটিও বরাদ্দ দিতে পারেনি সংস্থাটি।

বিসিকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ১৯টি শিল্পনগরী ও শিল্পপার্কের ৯৭৫টি শিল্পপ্লট বরাদ্দের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এ বছর ১৮টি শিল্পনগরী ও শিল্পপার্কে বরাদ্দযোগ্য প্লটের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৬৫টিতে। এক বছরের ব্যবধানে বরাদ্দের উদ্যোগ নেয়া প্লটের সংখ্যা বেড়েছে ৬৯০টি বা প্রায় ৭১ শতাংশ। নতুন কয়েকটি শিল্পনগরী ও প্লট যুক্ত হওয়ায় মোট সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে গত বছরের বিজ্ঞপ্তিতে থাকা বিপুলসংখ্যক প্লট এখনো উদ্যোক্তার অপেক্ষায় রয়েছে।

বিসিকের দুই বছরের বিজ্ঞপ্তির পাশাপাশি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের তালিকায় থাকা ১৯ শিল্পনগরীর মধ্যে ১৩টির প্লট এবারো বরাদ্দের তালিকায় রয়েছে। অর্থাৎ এক বছর আগে যেসব প্লটের জন্য উদ্যোক্তাদের কাছে আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল, সেগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশে এখনো বিনিয়োগকারী পাওয়া যায়নি।

সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় মুন্সীগঞ্জের বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন ও হালকা প্রকৌশল শিল্পনগরীতে। ২০২১ সালে স্থাপিত এ শিল্পনগরীর মোট ৩৬১ প্লটের মধ্যে শুরুতে মাত্র ২৯টি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। বাকি ৩৩২টি প্লট বরাদ্দের জন্য ২০২৫ সালে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলেও এক বছরে উদ্যোক্তা পেয়েছে মাত্র ছয়টি। এ বছর সেখানে ৩২৬টি প্লট বরাদ্দযোগ্য রাখা হয়েছে।

বিসিক কর্মকর্তাদের মতে, মুন্সিগঞ্জে প্রতি একর জমির মূল্য ৯ কোটি ১৬ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জমির মূল্য তুলনামূলক বেশি, শিল্প স্থাপনের ব্যয় এবং পর্যাপ্ত সংযোগ অবকাঠামোর ঘাটতি উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহের অন্যতম কারণ। রাজধানীর কাছাকাছি অবস্থান করেও যোগাযোগ ও শিল্প স্থাপনের অন্যান্য সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আসছে না বলে মনে করছেন তারা।

রাজশাহী-২ বিসিক শিল্পনগরীতেও পরিস্থিতি খুব বেশি ভিন্ন নয়। ২০২২ সালে স্থাপিত এ শিল্পনগরীতে গত বছর ২৩৭টি প্লট বরাদ্দের জন্য রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে এক বছরে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ২৮টি। এ বছর ২০৯টি প্লট বরাদ্দযোগ্য রয়েছে। যদিও রাজশাহীর পুরনো বিসিক শিল্পনগরীতে কোনো প্লট খালি নেই, নতুন শিল্পনগরীতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, স্থানীয় শ্রমবাজার ও ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গোপালগঞ্জ শিল্পনগরীর সম্প্রসারণ প্রকল্পেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫ সালের জুনে ৯৯টি শিল্পপ্লট বরাদ্দ ঘোষণা দেয়া হলেও উদ্যোক্তারা আগ্রহ দেখিয়েছেন ৪৭টিতে। এ বছর বাকি ৫২টি প্লটের জন্য নতুন করে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জে ৩১টির মধ্যে মাত্র দুটি, শ্রীমঙ্গলে ৬৫টির মধ্যে ছয়, বরগুনায় ২৩টির মধ্যে আট এবং চুয়াডাঙ্গায় ৫১টির মধ্যে ১৪টি প্লট বরাদ্দ দেয়া গেছে।

আরো উদ্বেগজনক পরিস্থিতি রাঙ্গামাটি ও মৌলভীবাজার শিল্পনগরীতে। দুই শিল্পনগরীতে চারটি করে মোট আটটি প্লটের মধ্যে একটিও বরাদ্দ দিতে পারেনি বিসিক। অন্যদিকে মাদারীপুর শিল্পনগরীর সম্প্রসারণে গত বছর ২৬টি প্লটের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলেও এবার বরাদ্দযোগ্য প্লটের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬৯টি। পাবনায় সাতটির পরিবর্তে এবার নয়টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হবে।

বিসিকের নতুন তালিকায় চট্টগ্রামের রাউজান শিল্পনগরী যুক্ত হয়েছে। এছাড়া বরিশাল, খাগড়াছড়ি ও মেহেরপুরে নতুন করে প্লট বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। রাউজানে ১৬৩টি, বরিশালে ১১২ এবং খাগড়াছড়ি ও মেহেরপুরে একটি করে প্লট বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সব এলাকার চিত্র এক নয়। ২০২৫ সালে কিশোরগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, লালমনিরহাট, পটুয়াখালী ও ভোলা শিল্পনগরীর প্রায় সব প্লটই উদ্যোক্তারা আবেদন করে বরাদ্দ নিয়েছেন।

স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ না থাকায় বড় শিল্পগ্রুপগুলোকে বিসিকের প্লট বরাদ্দ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রাজশাহী-২ শিল্পনগরীর প্লট স্কয়ার গ্রুপ ও নাবিল গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে বরাদ্দ দেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিল বিসিক। তবে পরিদর্শনের পর তারা বেসরকারি মালিকানাধীন জমি কিনে কারখানা স্থাপনে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিসিক কর্মকর্তারা। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও রাজশাহী শিল্পনগরীর প্লটের চেয়ে পাটকল ইজারায় বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে।

জানতে চাইলে বিসিক রাজশাহীর আঞ্চলিক পরিচালক জাফর বায়েজীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজশাহী সবসময়ই শিল্পের দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকা অঞ্চল। সরকারি সুযোগ-সুবিধার বিবেচনায় বিসিকের প্লটগুলো আকর্ষণীয় হলেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা অবশ্যই রিটার্ন বিবেচনা করেন। তবে বড় শিল্পগ্রুপগুলোকে আকৃষ্ট করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’ দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ধীরে হলেও প্লটগুলো বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।

খালি প্লটের পেছনে শুধু সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট নয়, অতীতে প্রকল্প নির্বাচন ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিষয়টি স্বীকার করে বিসিকের পরিচালক (শিল্প উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ) কাজী নজরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত সময়গুলোতে বেশকিছু প্রকল্পের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। যার কারণে বারবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও প্রকৃত উদ্যোক্তা পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক দেশীয় অর্থনৈতিক সংকটও এর জন্য কম দায়ী নয়। ভবিষ্যতের শিল্পনগরী বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এসব সীমাবদ্ধতাকে প্রাধান্য দিতে বিসিক কাজ করছে। পাশাপাশি বিদ্যমান খালি প্লটগুলো বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্পনগরীতে প্লট খালি থাকার পেছনে শুধু উদ্যোক্তার অভাব নয়, শিল্প স্থাপনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলারের উচ্চ মূল্য, ঋণপত্র খোলায় বিভিন্ন শর্ত, বিনিয়োগ ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্থানীয় উৎপাদন খাতে দুর্বল চাহিদার কারণে নতুন শিল্প স্থাপনে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন অনেক উদ্যোক্তা। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট শিল্প বিনিয়োগের ঝুঁকি আরো বাড়িয়েছে।

এদিকে বিসিকের নতুন উদ্যোগগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের সিরাজগঞ্জ শিল্পপার্ক কিছুটা ব্যতিক্রম। গত বছর যেখানে ৮৩টি প্লট বরাদ্দের কথা বলা হয়েছিল, এবার তা বেড়ে হয়েছে ৫৫৭টি। ২০২৪ সালে ৪০০ একর জমিতে স্থাপিত এ শিল্পপার্কে মোট প্লটের সংখ্যা ৮২৯টি। যমুনা সেতুর কাছাকাছি হওয়ায় সড়ক, নৌ ও রেল যোগাযোগের সুবিধা এ শিল্পপার্কের প্রতি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও