অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে টিম কুকের ১৫ বছরের অধ্যায় শেষ হলো। ২০১১ সালের আগস্টে বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান প্রযুক্তি কোম্পানিটির দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। তখন তার সামনে ছিল বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। কারণ পূর্বসূরি স্টিভ জবসকে তখন বিশ্বের অন্যতম সেরা উদ্ভাবক হিসেবে চিনত প্রযুক্তি বিশ্ব। জবসের উত্তরসূরি হিসেবে কুককে নিয়ে সবার প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশি।
কিন্তু ১৫ বছরে নিজের আলাদা নেতৃত্বের ধরন তৈরি করেছেন টিম কুক। তার সময়ে অ্যাপলের শেয়ারদর বেড়েছে ২ হাজার শতাংশের বেশি। চলতি বছরের জুলাইয়ে কোম্পানিটির বাজারমূল্য সাময়িকভাবে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে ইতিহাসের দ্বিতীয় কোম্পানি হিসেবে এ মাইলফলক স্পর্শ করে অ্যাপল।
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ডেভিড ইয়ফি অ্যাপল ও টিম কুককে নিয়ে একটি কেস স্টাডি লিখেছেন। তার মতে, কুক আইফোনের ব্যবসাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যা এত অল্প সময়ে সম্ভব হবে বলে কেউ ভাবেনি।
টিম কুকের সাফল্য শুধু নতুন পণ্য আনা বা পণ্যের নকশার ওপর নির্ভর করেনি। বরং কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা, সরবরাহ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সামলানোও তার নেতৃত্বের বড় অংশ ছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়েছে তাকে। অ্যাপলের আইফোন ব্যবসার জন্য দুই দেশই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দুই দেশের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গত কয়েক বছরে বেশ উত্তেজনাপূর্ণ ছিল।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ডিপওয়াটার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা অংশীদার জিন মুনস্টারের মতে, কুক শুধু একজন সিইও নন। তিনি অনেকটা রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকাও পালন করেছেন।
অ্যাপলের নেতৃত্বে আসার আগে কুকের মূল দক্ষতা ছিল পরিচালন ব্যবস্থা ও সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনায়। তবে তার শান্ত স্বভাব, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করার দক্ষতাই অ্যাপলের আইফোন ব্যবসাকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
কুকের নেতৃত্বে অ্যাপল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ব্যবসায়িক ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছে। একই সঙ্গে চীনের ওপর উৎপাদননির্ভরতা কিছুটা কমাতেও উদ্যোগ নেয় কোম্পানিটি। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ ছিল কুকের ওপর। তবে সব আইফোন যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি করার বদলে অ্যাপল দেশটিতে কার্যক্রম সম্প্রসারণে ৬০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। এর মধ্যে আইফোনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু যন্ত্রাংশ যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনের পরিকল্পনাও ছিল।
তবে চীনের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কমানো অ্যাপলের জন্য সহজ হয়নি। কভিড-১৯ মহামারী ও ট্রাম্পের শুল্কনীতি দেখিয়ে দিয়েছে, চীননির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থা কোম্পানিটির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অ্যাপলের বর্তমান সিইও জন টার্নাসকে এ চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে বলে মনে করছেন অনেকে।
চীনের পাশাপাশি ইউরোপেও অ্যাপলকে নিয়ন্ত্রকদের চাপ মোকাবেলা করতে হয়েছে। ইউরোপ অ্যাপলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার। সেখানে অ্যাপ স্টোর পরিচালনার নিয়মে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয় কোম্পানিটি।
অ্যাপলের সিইও হিসেবে বিদায়ের আগে কুক তার উত্তরসূরি জন টার্নাসকে একটি সহজ পরামর্শ দেন, ‘গ্রাহকদের জীবনকে আরো সমৃদ্ধ করে এমন পণ্য তৈরিতে মনোযোগ দিতে হবে।’
টিম কুকের ১৫ বছরের নেতৃত্বে অ্যাপল তাই শুধু একটি পণ্যনির্ভর প্রযুক্তি কোম্পানি হিসেবে থাকেনি। আইফোনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে সেবা, আনুষঙ্গিক পণ্য ও বড় একটি ব্যবসায়িক পরিসর।
—সিএনএন অবলম্বনে