নির্দিষ্ট কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ ভারত ও মিসরে স্থানান্তর করছেন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা। ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনের ফলে ক্রেতাদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করেছে তৈরি পোশাক শিল্পের দুই সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)। এ পরিস্থিতিতে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে বাতিলের দাবি জানিয়েছে সংগঠন দুটি।
গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেয়া এক যৌথ চিঠিতে এ দাবি জানায় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। চিঠিতে বলা হয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গত ৭ সেপ্টেম্বর ও ১৪ অক্টোবর জারি করা পৃথক আদেশের ফলে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চিঠিতে বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলা হয়, গত ২০ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বস্ত্র ও পোশাক খাত-সংক্রান্ত এক সভায় আলোচ্যসূচির বাইরে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের বিষয়টি উত্থাপন করেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) প্রতিনিধিরা। সভায় এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত না হলেও কার্যবিবরণীতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার ও ব্যাংক গ্যারান্টির বিষয়টি সিদ্ধান্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে দাবি করেছে সংগঠন দুটি।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৩১ আগস্ট জারি করা ওই সভার কার্যবিবরণী এনবিআরের আদেশ জারির আগে তাদের হাতে পৌঁছায়নি। ফলে এ বিষয়ে তারা অবগত ছিল না। পরবর্তী সময়ে কার্যবিবরণীর ভিত্তিতে ৭ সেপ্টেম্বর এনবিআর বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার এবং ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির আদেশ জারি করে। এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে শিল্পের অন্যতম প্রধান অংশীজন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সঙ্গে যথাযথ আলোচনা করা হয়নি বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে আরো বলা হয়, সংগঠন দুটির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এনবিআরকে চিঠি দিয়ে বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখার অনুরোধ জানায়। তবে ওই আদেশ প্রত্যাহার করা হয়নি। বরং ১৪ অক্টোবর একই বিষয়ে এনবিআর আরেকটি আদেশ জারি করে।
এ সিদ্ধান্তের প্রভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে সংশ্লিষ্ট কাউন্টের আমদানীকৃত সুতার চালান আটকে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। চিঠিতে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোর সুতার দাম বাড়ানোর বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর দাবি, ৭ সেপ্টেম্বর এনবিআরের আদেশের পর থেকে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রতি পাউন্ড সুতার দাম ৩০ থেকে ৫০ সেন্ট বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, আমদানীকৃত সুতার ক্ষেত্রে শুল্ক-কর পরিশোধ অথবা ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদানের কারণে রফতানিকারকদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্যকরী মূলধন আটকে যাচ্ছে।
চিঠিতে গত বছরের শুরু থেকে পোশাক শিল্পে একাধিক নীতি পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করেছে সংগঠন দুটি। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব নীতি পরিবর্তনের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং উৎপাদন-শৃঙ্খল বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে এনবিআরের ৭ সেপ্টেম্বর জারি করা আদেশ অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ পর্যন্ত এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকার সুপারিশ করেছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। পাশাপাশি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের পর বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর মধ্যে গঠনমূলক আলোচনা ও পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিকাঠামো প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠন দুটি। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বস্ত্র শিল্পের প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার করণীয় নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে তারা।