যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বর্জনের প্রবণতা জোরালো হচ্ছে কানাডায়। এতে দেশটির সুপার মার্কেটের তাকেও পরিবর্তন আসছে। ভোক্তাদের একটি বড় অংশ এখন পণ্য কেনার আগে সেটি কোথায় তৈরি বা উৎপাদন হয়েছে, তা যাচাই করছেন। মার্কিন পণ্য এড়িয়ে কানাডার পণ্য কেনার প্রবণতা বাড়ায় খুচরা বিক্রেতারাও সরবরাহ ব্যবস্থা বদলাতে শুরু করেছেন। খবর রয়টার্স।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কানাডীয় পণ্যের উৎস স্পষ্টভাবে জানানোর জন্য লেবেলিং বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন সরবরাহ উৎসও খুঁজছেন ব্যবসায়ীরা।
অন্টারিওর স্বতন্ত্র মুদি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ভিন্সেস মার্কেটের প্রেসিডেন্ট জিয়ানকার্লো ত্রিমার্কি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি দেখান, তার দোকানের তাকের বেশির ভাগ তাজা পণ্যই কানাডায় উৎপাদিত। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য দোকানে রাখার বিষয়ে ক্ষুব্ধ ক্রেতাদের ই-মেইল ও মন্তব্য পাওয়ার পর তিনি এ উদ্যোগ নেন বলে জানান।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে কানাডীয় ভোক্তারা তাদের খরচের অর্থ কোন দেশের ব্যবসায় যাচ্ছে, সে বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি সচেতন হয়ে উঠেছেন।
গত বছরের শুরুতেই কানাডায় ‘বাই কানাডিয়ান’ বা কানাডীয় পণ্য কেনার প্রচারণা জোরালো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করার পর এ প্রবণতা আরো বাড়ে। সম্প্রতি দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরো তীব্র হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে একটি জলভাগের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তও কানাডায় নতুন করে ক্ষোভ তৈরি করেছে।
ত্রিমার্কি বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার পরিস্থিতি অনেক বেশি তীব্র। টরন্টোর বৃহত্তর এলাকায় তার চারটি দোকানে এখন প্রায় ৯০ শতাংশ ফল ও সবজি নিজ দেশ থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করা স্ট্রবেরির পরিবর্তে এখন তিনি কুইবেক থেকে তা কিনছেন।
স্থানীয় উৎসে ঝুঁকে পড়ায় ব্যবসার খরচও বাড়ছে। এ কারণে তার প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপনের বাজেট কমিয়েছে। ত্রিমার্কির ভাষায়, আগে ব্যবসায়ীদের মান ও দামের মধ্যে ভারসাম্য করতে হতো। এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পণ্যের উৎপত্তির দেশ। অর্থাৎ মান, দাম ও কোন দেশে পণ্যটি তৈরি হয়েছে, এ তিন বিষয় বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
কানাডার সবচেয়ে বড় খাদ্য খুচরা বিক্রেতা লবলা কোম্পানিজও পরিবর্তিত ভোক্তা আচরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আগস্টে ফল ও তাজা খাদ্যপণ্যের বিভাগে কানাডীয় পণ্যের পরিচয় দিতে ম্যাপল পাতার বড় সাইনবোর্ড চালু করেছে।
দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম মুদি বিক্রেতা মেট্রোও জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে কানাডার স্থানীয় পণ্যকে অগ্রাধিকার দেয়া অব্যাহত থাকবে।
কানাডিয়ান ফেডারেশন অব ইনডিপেনডেন্ট গ্রোসার্সের পাবলিক পলিসি ও অ্যাডভোকেসি বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট গ্যারি স্যান্ডস বলেন, ‘কানাডীয় ভোক্তাদের মানসিকতায় স্থায়ী পরিবর্তন এসেছে। অর্থাৎ মার্কিন পণ্য কেনার বিষয়টি এখন শুধু দাম বা মানের ওপর নির্ভর করছে না। পণ্যের উৎপত্তির দেশও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’
কানাডার খাদ্যপণ্যের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব এখনো অনেক বেশি। বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম তাজা সবজি আমদানিকারক কানাডা। দেশটির তাজা সবজি আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস এখনো যুক্তরাষ্ট্র। মোট আমদানির অর্ধেকের বেশি আসে প্রতিবেশী দেশটি থেকে। এরপর রয়েছে মেক্সিকো।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবজি আমদানির অংশ কমছে। সরকারি সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, জুলাইয়ে কানাডার সবজি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের হিস্যা ছিল ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৩ সালের একই মাসে এ হার ছিল ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগের সময়ের তুলনায় হিস্যা কমেছে।
ফলের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ উৎস। জুলাই পর্যন্ত কানাডার আমদানি করা ফলের অর্ধেকের বেশি গেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
গত ২১ আগস্ট দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর নতুন করে শুল্ক ও পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়। এতে কানাডীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিকল্প সরবরাহ উৎস খোঁজার প্রবণতা আরো বেড়েছে।
টরন্টোর বাসিন্দা ২৭ বছর বয়সী সফটওয়্যার প্রকৌশলী জন অ্যামবার্ড বলেন, ‘সম্ভব হলে তিনি এখন মার্কিন পণ্য কেনা এড়িয়ে চলেন। এর পরিবর্তে কানাডীয় ব্র্যান্ড ও ব্যবসাকে সমর্থন করতে চান। কোনো পণ্য কেনার আগে তিনি লেবেল দেখেন। প্রয়োজনে অনলাইনে প্রতিষ্ঠানের তথ্যও খুঁজে দেখেন।’
বিশ্লেষকদের মতে, কানাডার জন্য স্থানীয়ভাবে তাজা খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো সহজ নয়। দেশটির শীতকাল দীর্ঘ ও কঠিন। ফলে বছরের একটি বড় সময়ে তাজা সবজির চাহিদা মেটাতে গ্রিনহাউজ, সংরক্ষণ করা মূলজাতীয় সবজি ও আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি অনেক সময় তুলনামূলক সাশ্রয়ী।
দেশটির সরকার আগামী ১০ বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এর একটি অংশ গ্রিনহাউজ স্থাপনে ব্যয় করা হবে। শীতের মাসগুলোয় দেশে ফল ও সবজির উৎপাদন বাড়ানোই এর লক্ষ্য।
কানাডায় খাদ্য মুদ্রাস্ফীতিও বড় উদ্বেগের বিষয়। জি৭-ভুক্ত উন্নত দেশগুলোর মধ্যে দেশটিতে খাদ্যের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। তাই স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যের সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে সরকার।
কানাডার অভ্যন্তরেও পণ্য সরবরাহে কিছু বাধা রয়েছে। বিভিন্ন প্রদেশে আলাদা নিয়মকানুন ও বিধিনিষেধ থাকায় এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে খাদ্যপণ্য সরবরাহ করা সবসময় সহজ নয়। ফলে অনেক মুদি ব্যবসায়ী এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক পরিবর্তনের কিছু অংশ দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। কারণ একবার বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি হয়ে গেলে ব্যবসায়ীরা তা ধরে রাখতে চাইতে পারেন। একই সঙ্গে কানাডীয় ভোক্তাদের একটি অংশও পণ্যের উৎপত্তি নিয়ে আরো সচেতন হয়ে উঠেছেন।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভবিষ্যতে স্বাভাবিক হলেও কানাডার সুপার মার্কেটের বাজার আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে যাবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।