বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবসার ধারণাটি বিস্তৃত হলেও ব্যাংকিং খাতে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সচেতনতার অভাব এখনো রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, দেশের মাত্র ৬৪ শতাংশ ব্যাংকার এই ধারণার সঙ্গে ‘কিছুটা পরিচিত’। ২৭ শতাংশ ব্যাংকার সামাজিক ব্যবসার নাম শুনলেও ৯ শতাংশ ব্যাংকার একেবারেই ধারণাটির সঙ্গে অপরিচিত।
মঙ্গলবার (৮ জুলাই) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) আয়োজনে ‘বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবসার অর্থায়নে ব্যাংকের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য উঠে আসে। কি-নোট উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ড. প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জি, সহযোগী অধ্যাপক ড. শহীদ উল্লাহ, ফ্যাকাল্টি মেম্বার ড. মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম সরকার ও গ্রামীণ ট্রাস্টের নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল হাই খান।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রবর্তিত সামাজিক ব্যবসার মডেল বিশ্বজুড়ে সফলতা পেলেও বাংলাদেশে এর বাস্তবায়ন এখনো সীমিত। সামাজিক ব্যবসার ধারণার জন্মস্থান বাংলাদেশ হলেও জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ অনেক দেশে সরকারি সহায়তা ও নীতিগত কাঠামো তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী, ফলে এসব দেশে সরকার, করপোরেট ও আর্থিক খাত মিলেই এর বিস্তার ঘটাচ্ছে।
বাংলাদেশে এ খাতে নেতৃত্ব সীমিত কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। গ্রামীণ ও ব্র্যাক মিলে মাত্র ৪৮টি সামাজিক ব্যবসা পরিচালনা করছে। গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোর মাত্র ১৮ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে সামাজিক ব্যবসায় অর্থায়নে যুক্ত রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে সামাজিক ব্যবসা এখন একটি শক্তিশালী উন্নয়ন কৌশলে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশে প্রবর্তিত এই মডেল ছড়িয়ে পড়েছে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ভারতে, যেখানে শত শত প্রতিষ্ঠান এর বাস্তবায়নে সক্রিয়। জাপানে ২০১৫ সালেই ২ লাখ ৫ হাজার সামাজিক ব্যবসা ছিল, যেখানে ৫৭ লাখ মানুষ নিয়োজিত। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় (METI) ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান জাপান ফাইন্যান্স করপোরেশন (জেএফসি) স্বল্পসুদে ঋণ, ভর্তুকি ও প্রশিক্ষণ দিয়ে এ খাতকে সহায়তা করে। প্যানাসনিক ও টয়োটার মতো করপোরেট জায়ান্ট তাদের সিএসআর ফান্ড এই খাতে ব্যয় করছে।
বিশ্বজুড়ে সামাজিক ব্যবসা এখন আর শুধু একটি ধারণা নয়—এটি হয়ে উঠেছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্য মোকাবেলার একটি কার্যকর কৌশল। বাংলাদেশে প্রবর্তিত এই মডেল এখন ছড়িয়ে পড়েছে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারতসহ বহু দেশে, যেখানে শত শত প্রতিষ্ঠান এটি বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক ব্যবসা মূলত বাজারনির্ভর। একুমেন, জিআইআইএন, ব্লু-অরচার্ড এর মতো শতাধিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টর প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিনিয়োগ করছে। সোশাল ইনোভেশন ফান্ডের মাধ্যমে সরকারও সীমিত সহায়তা দেয়।
ইউরোপে সামাজিক ব্যবসা পরিচালিত হয় কো-অপারেটিভ ও মিউচুয়াল মডেলে। ইউরোপিয়ান কমিশনের এন্টারপ্রাইজ ডিরেক্টরেট জেনারেল ১৯৮৯ সাল থেকেই এই খাতকে অনুদান ও নীতিগত সহায়তা দিয়ে আসছে। ভারতে আভিস্কার, ওমনিভোর, এলিভার ইকুইটি এর মতো প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন পর্যায়ে সামাজিক উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছে। দেশটিতে সামাজিক ব্যবসা এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেমে পরিণত হয়েছে।
বিআইবিএমের গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোকে সামাজিক ব্যবসায় বিনিয়োগের আহবানের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তার পাশাপাশি আইন প্রয়োজন বলে জানায় গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। বক্তারা জানান, সামাজিক ব্যবসার টেকসই বিস্তারে প্রধান বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা। ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীরা এ খাতে বিনিয়োগে অনাগ্রহী মূলত মুনাফার অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকির কারণে। ফলে অধিকাংশ সামাজিক ব্যবসা এখনো অনুদান, দান অথবা অল্পসংখ্যক উচ্চ-সম্পদশালী ব্যক্তির অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান নুরুন নাহার বলেন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনতে সামাজিক ব্যবসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি জানান, বিশ্বের অনেক দেশ এরই মধ্যে এই মডেলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকেও এ খাতে অর্থায়ন সম্ভব, তবে নিশ্চিত করতে হবে যেন তা রিটার্নভিত্তিক হয়।
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকের সিএসআর তহবিলের সবটুকু সামাজিক ব্যবসায় খরচ করা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, ‘একটি যৌক্তিক পরিমাণ অর্থ সামাজিক ব্যবসায় বরাদ্দ দিতে হবে এবং সেখানে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করলেই বিনিয়োগের কার্যকারিতা আসবে। সামাজিক ব্যবসা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব নয়, উদ্যোক্তা ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎও টেকসই হবে না।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক এস এম আব্দুল হাকিম বলেন, ব্যাংকের সিএসআর তহবিল সামাজিক ব্যবসার জন্য একটি সম্ভাবনাময় উৎস। তবে এর পাশাপাশি করপোরেট গ্রুপগুলোর মুনাফার নির্দিষ্ট একটি অংশ সরকারের মাধ্যমে সংগঠিতভাবে সামাজিক ব্যবসায় ব্যয় করা গেলে, সেটি সিএসআরের তুলনায় বহু গুণ বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।