কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে টেক জায়ান্টরা। তৈরি করছে নতুন ডেটা সেন্টার, কিনছে উন্নত চিপ। তবে এত এত বিনিয়োগের তুলনায় আয় কতটা বাড়ছে, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। এর প্রভাব পড়ছে শেয়ারবাজারেও। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের চার বড় প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যামাজন, মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যালফাবেটের শেয়ারদর কমেছে। সব মিলিয়ে এসব কোম্পানির বাজারমূল্য থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় ৯০০ বিলিয়ন বা ৯০ হাজার কোটি ডলার। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ দ্রুত বাড়লেও সেই বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় আসছে না। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর মূল ব্যবসায় প্রবৃদ্ধির গতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুনাফা করা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থায়ও পরিবর্তন দেখা গেছে সম্প্রতি। অনেকেই এখন বিনিয়োগের অর্থ জোগাতে নিজেদের নগদ অর্থের ওপর নির্ভর করতে পারছে না। বরং অনেক প্রতিষ্ঠান নগদ অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি ঋণ ও শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে নতুন মূলধন সংগ্রহের পথে হাঁটছে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হয় ‘হাইপারস্কেলার’। অ্যামাজন, মেটার পাশাপাশি মাইক্রোসফট ও গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট এ তালিকায় রয়েছে। এআই প্রযুক্তির বিস্তারে ডেটা সেন্টার, সার্ভার ও চিপের চাহিদা বাড়ায় এসব কোম্পানি বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। তবে সাম্প্রতিক আর্থিক ফলাফল প্রকাশের পর বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়া বলছে, শুধু ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখিয়ে বাজারকে আর সন্তুষ্ট করা যাচ্ছে না। বিনিয়োগের বিপরীতে আয় ও নগদ অর্থের প্রবাহ কতটা বাড়ছে, তারও প্রমাণ চাইছেন তারা।
চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে চার কোম্পানির মূলধনি ব্যয় (ক্যাপেক্স) হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আগের বছরের একই প্রান্তিকে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মূলধনি ব্যয় ছিল ১ হাজার ১৩০ কোটি ডলার। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭০ কোটি ডলারে। মূলত চিপ কেনা ও ডেটা সেন্টার নির্মাণে এ অর্থ ব্যয় করছে কোম্পানিগুলো।
এত দিন নিজেদের ব্যবসা থেকে পাওয়া নগদ অর্থ দিয়েই নতুন বিনিয়োগের খরচ মেটাত প্রযুক্তি জায়ান্টরা। কিন্তু এআই অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কয়েকটি কোম্পানির জন্য এখন তা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে এসব কোম্পানিকে নিজেদের হাতে থাকা নগদ অর্থের বাইরে অর্থের সংস্থান করতে হচ্ছে। এর মধ্যে আছে ঋণ নেয়া ও নতুন শেয়ার ছাড়া।
বিশ্ববাজারে এআই নিয়ে যে বিনিয়োগের উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে, তার স্থায়িত্ব নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে এআই খাত। প্রযুক্তিটির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনায় বিনিয়োগকারীরা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু অবকাঠামো তৈরিতে ব্যয় বাড়ার পরও আয় সেই অনুপাতে না বাড়লে কোম্পানিগুলোর মুনাফায় চাপ তৈরি হতে পারে। এ আশঙ্কাই এখন বাজারে প্রভাব ফেলছে।
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো এআই অবকাঠামো তৈরির বাস্তব সীমাবদ্ধতা। শুধু অর্থ থাকলেই দ্রুত ডেটা সেন্টার তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এআই সেবার চাহিদা থাকলেও সব কোম্পানি তাৎক্ষণিকভাবে তা পূরণ করতে পারছে না।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান জেফারিজের বিশ্লেষক ব্রেন্ট থিল বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কারণ শুধু আর্থিক ফল নয়। কোম্পানিগুলোর আয় ভালো হলেও তা প্রত্যাশার চেয়ে খুব বেশি নয়। একই সঙ্গে অবকাঠামো নির্মাণের সীমাবদ্ধতার কারণে হাইপারস্কেলার প্রতিষ্ঠানগুলো সব গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করতে পারবে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সব মিলিয়ে বাজারে এ মুহূর্তে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’
এদিকে অ্যামাজনের আর্থিক প্রতিবেদনও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এআই অবকাঠামো তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে কোম্পানিটি। তৃতীয় প্রান্তিকে অ্যামাজনের মূলধনি ব্যয় বেড়ে রেকর্ড ৭ হাজার ৫৮০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও উন্নত চিপ কেনার পেছনে এ অর্থ ব্যয় করছে প্রতিষ্ঠানটি, যার প্রভাব পড়েছে নগদপ্রবাহে। গত প্রান্তিকে অ্যামাজনের মুক্ত নগদপ্রবাহ (ফ্রি ক্যাশ ফ্লো) ঋণাত্মক ৩ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।
মুক্ত নগদপ্রবাহ বলতে কোম্পানির পরিচালন কার্যক্রম থেকে পাওয়া নগদ অর্থ থেকে মূলধনি ব্যয় বাদ দেয়ার পর অবশিষ্টকে বোঝায়। এ অর্থ দিয়ে কোম্পানি ঋণ পরিশোধ, নতুন বিনিয়োগ কিংবা শেয়ারধারীদের লভ্যাংশ দিতে পারে। এ সূচক ঋণাত্মক হলে বোঝায়, নির্দিষ্ট সময়ে কোম্পানির মূলধনি ব্যয় পরিচালন কার্যক্রম থেকে পাওয়া নগদ অর্থের চেয়ে বেশি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট। বৃহস্পতিবার কোম্পানিটির শেয়ারদর ১৩ শতাংশ কমেছে। এতে বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলার হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তৃতীয় প্রান্তিকে অ্যালফাবেটের মূলধনি ব্যয় ৫ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়।
একই সময়ে কোম্পানিটির মুক্ত নগদপ্রবাহ ঋণাত্মক ৯১০ কোটি ডলারে নেমেছে।
২০০৪ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো নগদ অর্থের এমন ঘাটতিতে পড়েছে অ্যালফাবেট। এ পরিস্থিতির পাশাপাশি গুগলের মূল সার্চ ব্যবসার প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়াও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেটার অবস্থাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। গত প্রান্তিকে কোম্পানিটি এআই অবকাঠামো তৈরিতে ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। পুরো বছরে এ খাতে ব্যয় ১৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিপুল বিনিয়োগের পরও তৃতীয় প্রান্তিকে মেটার মুক্ত নগদপ্রবাহ ছিল ঋণাত্মক ২১০ কোটি ডলার। ২০১২ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর এই প্রথম কোনো প্রান্তিকে নগদ অর্থের এমন ঘাটতিতে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিটি। এদিকে খবরটি প্রকাশের পর গত সপ্তাহে মেটার শেয়ারদর কমে ৬ শতাংশ।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বার্নস্টেইনের বিশ্লেষক মার্ক শমুলিক অবশ্য প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতনকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এসব কোম্পানির ব্যবসা এখনো প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে। তবে আগামী বছর বিনিয়োগের পরিমাণ আরো বড় আকারে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। বিশেষ করে ২০২৭ ও ২০২৮ সালে মূলধনি ব্যয় কতটা বাড়বে এবং সে অর্থ কোত্থেকে আসবে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।