সম্প্রতি জ্বালানি তেল ও সারের বাজারে যে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধাক্কার কারণে ২০২৭ সালের মধ্যে সুপারমার্কেটগুলোয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আবারো বেড়ে যেতে পারে। খবর ইউরো নিউজ।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা অক্সফোর্ড ইকোনমিকস এবং জার্মানির ডয়চে ব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০২৭ সালে ইউরোজোনের দেশগুলোয় খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে ইরান যুদ্ধ নয়, বরং বড় প্রভাবক হিসেবে দেখা দিতে পারে চলতি বছরের তীব্র তাপপ্রবাহ ও জলবায়ুর পরিবর্তন। সরবরাহ চেইনে এর প্রভাব পড়তে সাধারণত এক বছরেরও বেশি সময় লাগে। ফলে বর্তমানের নিম্নমুখী প্রবণতা সাময়িক হতে পারে এবং আগামী বছর নাগাদ খাবারের দাম আবারো বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি ও সারের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই খুচরা বাজারে প্রভাব পড়ে না। এ বাড়তি খরচ প্রথমে কৃষকেরা বহন করেন। এরপর তা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, পাইকারি বিক্রেতা এবং সবশেষে সুপারমার্কেট বা খুচরা বাজারে পৌঁছায়। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে সাধারণত এক বছরের মতো সময় লেগে যায়।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে ইউরোজোনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছতে পারে, যা চলতি বছরের জুনে ছিল ১ দশমিক ৬ শতাংশ। সংস্থাটি ধারণা করছে, শুধু বৈরী আবহাওয়ার কারণে আগামী বছর খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে অতিরিক্ত ১ শতাংশ যোগ হতে পারে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ টমাস ডভোরাক ও প্রধান অর্থনীতিবিদ রিকার্ডো আমারো বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ায় সারের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধি যতটা মারাত্মক হবে বলে মনে করা হয়েছিল, ততটা হয়নি। তবে এটি ফসলের উৎপাদন ও ফলনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।’
ডয়চে ব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানি তেল ও সারের দাম সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কিছুটা কমলেও মার্চ-জুন মেয়াদের ধাক্কায় আগামী বছর যুক্তরাজ্যে ১ দশমিক ৩ ও ইউরোজোনে দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত খাদ্যের দাম বাড়তে পারে।
ফলে দেশগুলোর সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে দশমিক ১ থেকে দশমিক ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি চাপ তৈরি হবে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকস মনে করে, এ পণ্য সংকটের কারণে আগামী ১২ মাসে ইউরোজোনের খাদ্য মূল্যস্ফীতি দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে। এ প্রভাব প্রক্রিয়াজাত খাবারের চেয়ে কাঁচাপণ্যের ওপর অনেক দ্রুত দৃশ্যমান হবে।
কৃষিতে জ্বালানি ও সারের দাম সরাসরি প্রভাব ফেলে। প্রথমত, ট্র্যাক্টর চালানো, পণ্য পরিবহন, প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেজিংয়ের জন্য জ্বালানি প্রয়োজন হয়। দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়লে সারের উৎপাদন খরচ বাড়ে। তৃতীয়ত, সারের ব্যবহার কমলে বা চাষাবাদের ধরন বদলে গেলে তার প্রভাব পরবর্তী ফসল তোলার পর বাজারে দৃশ্যমান হয়।
ইউরোপের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের হিসাব অনুযায়ী, ইউরোজোনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ। তা কমে ২০২৬ সালের জুনে ১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। এটি ২০২১ সালের মধ্যভাগের পর সর্বনিম্ন খাদ্য মূল্যস্ফীতি। ২০২৫ সালে রেকর্ড বৃদ্ধির পর সম্প্রতি চকোলেট, কোকো ও কফির দাম স্থিতিশীল হয়েছে। অন্যদিকে শস্যের পর্যাপ্ত উৎপাদন এবং অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দুগ্ধজাত পণ্যের দাম কমেছে। এছাড়া ২০২২ সালের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির পর অলিভ অয়েলের দামও কমছে।
ডয়চে ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে চিনি, মিষ্টিজাতীয় খাদ্য ও কফি মূল্যস্ফীতি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখলেও এখন তা কমেছে। তবে মাংসের দাম আগের চেয়ে কমলেও তা এখনো মূল্যস্ফীতির অন্যতম বড় কারণ হিসেবে রয়ে গেছে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের মতে, তিন মাসে প্রায় অর্ধেক খাদ্যপণ্যের দাম কমেছে। মাত্র ২০ শতাংশ পণ্যের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, মূল্যস্ফীতি কমার এ প্রবণতা সাময়িক ও দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কাটি এখনো আসতে বাকি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি ও প্যাকেজিংয়ের খরচের চেয়েও বড় উদ্বেগের কারণ চলতি বছরের তীব্র দাবদাহ ও খরা। ইউরোপজুড়ে তীব্র গরমের কারণে ফসলের ক্ষতি এরই মধ্যে অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এর ওপর এল নিনোর প্রভাবে আবহাওয়া আরো চরম রূপ নিতে পারে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকস জানিয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়ায় ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) খাদ্যপণ্যের দাম হঠাৎ অনেক বেড়ে যাবে, যা বছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) গিয়ে হয়তো কিছুটা কমতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মূল্যস্ফীতিকে স্থায়ীভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) ২০২৩ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা খাদ্যপণ্যের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাবিত করে। এ প্রভাব আবহাওয়া বিপর্যয়ের পরও প্রায় এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
ইসিবি অনুমান করছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বজুড়ে বার্ষিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি দশমিক ৯২ থেকে ৩ দশমিক ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ২০২২ সালের দাবদাহের কারণে ইউরোপে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দশমিক ৬৭ শতাংশ বেড়েছিল। ২০৩৫ সালের জলবায়ু পরিস্থিতিতে একই ধরনের দাবদাহ দেখা দিলে মূল্যস্ফীতি ১ শতাংশেরও বেশি বাড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ফসল অতিরিক্ত তাপ সহ্য করতে পারে না। ফলে উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয় এবং বাজারে পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়।