মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও এল নিনোর প্রভাব

বিশ্বজুড়ে গম উৎপাদন কমতে পারে প্রায় আড়াই কোটি টন

ভূরাজনৈতিক সংঘাত, প্রতিকূল আবহাওয়া, সারসহ কৃষি উপকরণের উচ্চ মূল্যের কারণে বিশ্বজুড়ে গম উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমতে পারে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ মৌসুমে বিশ্বজুড়ে গম উৎপাদন অন্তত ২ কোটি ৪০ লাখ টন পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য বিজনেসলাইন।

বাজার বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার কৃষকরা গম আবাদ কমিয়ে বিকল্প শস্যের দিকে ঝুঁকছেন। একই সঙ্গে কৃষ্ণ সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান উত্তেজনায় সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিশ্ববাজারে গমের দাম বেড়ে দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতি বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ তৈরি করছে।

সরবরাহ ঘাটতি ও চাহিদা বৃদ্ধি

আন্তর্জাতিক শস্য পরিষদের (আইজিসি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ মৌসুমে বিশ্বে মোট গম উৎপাদন দাঁড়াতে পারে ৮২ কোটি ১০ লাখ টনে, যা আগের মৌসুমে ছিল ৮৪ কোটি ৪০ লাখ টন। তবে উৎপাদন কমলেও খাদ্য, বীজ ও শিল্প খাতে ব্যবহার বাড়ায় গমের বৈশ্বিক চাহিদা বেড়ে ৮২ কোটি ৮০ লাখ টনে পৌঁছতে পারে। ফলে বিশ্ববাজারে গমের ব্যবসায়িক লেনদেন ২১ কোটি ৬০ লাখ টন থেকে কমে ২০ কোটি ৫০ লাখ টনে নামতে পারে এবং দিনশেষে মজুদ কমে দাঁড়াতে পারে ২৭ কোটি ৯০ লাখ টনে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) একই ধরনের তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, আগামী মৌসুমে বিশ্বে গম উৎপাদন ৩ শতাংশ কমতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে গমের আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় এক শতকের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে।

জলবায়ুর প্রভাব ও বিকল্প ফসলে আগ্রহ

গম উৎপাদন হ্রাসের পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে আবহাওয়ার বিশেষ পরিস্থিতি ‘এল নিনো’। খরা ও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলীয় সমভূমি ও পশ্চিম ইউরোপের বিশাল অংশের ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউরোপীয় শস্য বাণিজ্য সংস্থার (কোকেরাল) তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্যে মোট শস্য উৎপাদন কমে ২৬ কোটি ৩ লাখ টনে নামতে পারে। বিশেষ করে ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ড ও স্পেনে গমের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

অন্যদিকে উচ্চ মূল্যের কারণে এবং বেশি লাভের আশায় কৃষকরা অন্য ফসল আবাদের দিকে ঝুঁকছেন। কানাডায় ক্যানোলা, ভুট্টা ও সয়াবিনের আবাদ রেকর্ড পরিমাণে বাড়লেও গমের আবাদ কমেছে। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ায়ও গমের বপন সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে।

সংঘাত ও পরিবহন খাতে সংকট

যুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক কৃষির সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে সারের কাঁচামাল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণ সাগরে শস্য রফতানি চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। সম্প্রতি ওডেসার কাছে শস্যবাহী জাহাজ এবং কৃষ্ণ সাগরীয় বন্দরে রকেট হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় রাশিয়ার শস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান সভকন তাদের গম রফতানির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ কোটি ৪৬ লাখ টনে নামিয়েছে।

ঊর্ধ্বমুখী বাজার

সরবরাহ সংকটে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম বুশেলপ্রতি ৬ ডলার ৮০ সেন্ট ছাড়িয়ে গেছে। শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (সিবিওটি) গমের ফিউচার মূল্য এখন দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চের কাছাকাছি অবস্থান করছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছর পর্যন্ত এল নিনো এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব বজায় থাকলে ২০২৭-২৮ মৌসুমেও খাদ্যশস্যের আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির থাকতে পারে।

আরও