আমদানি বাজারের চেয়েও পাইকারিতে বাড়তি দামে লেনদেন

নতুন মৌসুমের এলাচের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি

দেশে গরমমসলার মধ্যে বিলাসীপণ্য ধরা হয় এলাচকে।

বৈশ্বিক বাজারের কারণে কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে পৌঁছেছে পণ্যটির দাম। বর্তমানে প্রধান সরবরাহকারী দেশ থেকে আমদানি কমে গেলেও চোরাইপথে নতুন মৌসুমের এলাচ আসায় পণ্যটির পাইকারি দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। পাইকারি বাজারে দাম বাড়ায় খুচরায়ও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্ববাজারে নতুন মৌসুমের এলাচের উৎপাদন ও বিপণন মৌসুম শুরু হয়েছে। বুকিং দাম বেশি থাকায় এখনো গুয়াতেমালাসহ প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলো থেকে এলাচ দেশে এসে পৌঁছায়নি। বর্তমানে আগের সরবরাহকৃত ২০২৪-২৮ মেয়াদি (উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত মেয়াদোত্তীর্ণ সময়সীমা) এলাচ কেজিপ্রতি ৩ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে এলাচের দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে ২০০ টাকা। তবে দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোয় ভারত থেকে আসা নতুন মৌসুমের (২০২৫-২৯) এলাচ কেজিপ্রতি ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যার কারণে খুচরা বাজারেও এলাচের দাম কেজিপ্রতি ৫০০-৭০০ টাকা বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ববাজার থেকে আমদানি হওয়া এলাচ সর্বোচ্চ চার বছর ব্যবহারযোগ্য থাকে। শুরুতে এলাচের রঙ থাকে সবুজ। তবে মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এলাচের বাহ্যিক রঙ হলুদ বা বাদামি রঙ ধারণ করে। এ সময় এলাচের চাহিদা ও দাম দুটোই কমে যায়। বর্তমানে দেশের প্রধান পাইকারি বাজারগুলোয় ২০২৪-২৮ মৌসুমের এলাচের সরবরাহ বেশি। পুরনো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এবং নতুন মৌসুমের শুরুতে দাম কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু বিশ্ববাজারে এলাচের বুকিং দর বেশি থাকায় বৈধপথের চেয়ে সীমান্তের চোরাইপথ দিয়ে ভারত থেকেই অবাধে এলাচ প্রবেশ করছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলো হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে এসব এলাচ। নতুন মৌসুমের এলাচের মান ভালো হওয়ায় বৈধ পথে সরবরাহ সংকটের কারণে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা।

জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের মেসার্স গুলিস্তান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে এখনো নতুন মৌসুমের এলাচের সরবরাহ শুরু হয়নি। তবে ২০২৪-২৮ মৌসুমের এলাচের মজুদ কমে আসায় দাম কিছুটা বেড়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এলাচের পাইকারি দাম কেজিপ্রতি ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ছাড়াও প্রধান উৎসব শেষ হওয়ায় এলাচসহ সব ধরনের মসলাপণ্যের চাহিদা কম।’

আবার সর্বশেষ বাজেটে প্রধান ৬০টি কমোডিটি পণ্য আমদানিতে সরকার শুল্ক সুবিধা দেয়ায় বাজারে পণ্যের দাম নিম্নমুখী। এ অবস্থায় দেশের সাধারণ পাইকারি বাজার ও খুচরা বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রান্তিক পাইকারি বাজারগুলোয় এলাচের কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে মানভেদে ৫০০-৭০০ টাকা। আবার খুচরা পর্যায়ে গিয়ে কেজিপ্রতি এলাচের দাম বেড়েছে ৮০০-১০০০ টাকা। দামি মসলাপণ্য হওয়ায় খুচরা পর্যায়ে সীমিত পরিমাণ ক্রয়-বিক্রয়ের কারণে দাম বাড়তি নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে আমদানি হওয়া বিভিন্ন গরমমসলার দাম নিম্নমুখী থাকলেও শুধু এলাচের দাম বেড়েছে। বৈধপথে আমদানি প্রক্রিয়া শুরু হলে বাজার আবারো স্থিতিশীলতায় ফিরতে পারে বলে আশা করছেন তারা।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া এলাচ আমদানি হয় মূলত ভারত ও গুয়াতেমালা থেকে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি এলাচ উৎপাদনকারী দেশ আমেরিকার গুয়াতেমালা হলেও পরিবহন সুবিধা ও দাম কম হওয়ায় ভারতের এলাচই বেশি বিক্রি হয়। ফলন ভালো হওয়ায় গুয়াতেমালাসহ ভারতের নিলাম বাজারগুলোয় এলাচের দাম কমতির দিকে ছিল। তবে গত কয়েক মাসে এলাচের বুকিং দর কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী থাকায় দেশের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এরই মধ্যে ভারতীয় এলাচের সরবরাহ বাড়ায় পাইকারি ও খুচরা বাজারে পণ্যটির দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।

প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে দেশে এলাচের পাইকারি দাম কেজিপ্রতি (আমদানি পর্যায়ে) ৫ হাজার টাকার কাছাকাছি পৌঁছায়। ওই সময় এলাচের সরবরাহ পর্যায়ে পাইকারি দাম কেজিপ্রতি ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকে। ফলে খুচরায় এলাচের দাম ৬ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেলেও বছরের শেষার্ধে দাম কমতে শুরু করে। কয়েক মাস আগে দেশে এলাচের কেজিপ্রতি পাইকারি দাম কমে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় নেমেছিল। কিন্তু নতুন মৌসুমে দাম আবারো বাড়তে শুরু করেছে।

আরও