সম্প্রতি এ সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। পানির চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান, উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ওয়াটার ডিরেক্টর সরোজ কুমার ঝা।
দুবাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনালকে তিনি বলেন, ‘পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা ও এ সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে অর্থনীতির সংকোচন ঘটবে।’
তার মতে, বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে যেখানে পানি আর কেবল কোনো ‘সহায়ক সম্পদ’ নয়, বরং এটি উৎপাদনের পথে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। পানির অব্যবস্থাপনার মধ্যে আছে প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিকভাবে ব্যবহার না করা, অপচয় করা, পানি সংরক্ষণ না করা ও সবার মধ্যে ন্যায্যভাবে ভাগ না হওয়া।
সংকটের ভয়াবহতা ও পানির চাহিদা
বর্তমানে বিশ্বের অন্তত ২৫টি দেশের মানুষ প্রতি বছর চরম পানি সংকটের মুখোমুখি। এসব দেশে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ বসবাস করে। ২০৩০ সালের মধ্যে পানির চাহিদা জোগানের চেয়ে অন্তত ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের (ডব্লিউআরআই) প্রাক্কলন অনুযায়ী পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। সংস্থাটির মতে, ২০৩০ সালে পানির চাহিদা প্রাপ্যতার তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পানির অভাব সরাসরি প্রভাব ফেলছে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয়। এর মধ্যে আছে কৃষি, জ্বালানি এবং শিল্প ও প্রযুক্তি খাত। বিশ্বজুড়ে মিঠা পানির ৭০ শতাংশই ব্যবহার হয় কৃষিকাজে। এছাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ঠাণ্ডা রাখার প্রক্রিয়া এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে পানির প্রয়োজন অপরিহার্য। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডেটা সেন্টারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি খাতগুলো এখন অত্যন্ত পানিনির্ভর হয়ে উঠেছে। যেমন একটি বড় ডেটা সেন্টারে দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ গ্যালন পানির প্রয়োজন হতে পারে, যা একটি ছোট শহরের মোট ব্যবহারের সমান।
জাতিসংঘের মতে, অতিরিক্ত পানি ব্যবহার আর চলমান খরার কারণে বিশ্ব এমন এক সংকটে পড়েছে, যেখানে পানির মজুদ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। বিশ্বজুড়ে যতটা পানি ব্যবহার হচ্ছে, ততটা নতুন করে পাওয়া যাচ্ছে না।
জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব
গ্লোবাল কমিশন অন দি ইকোনমিকস অব ওয়াটারের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে পানি সংকটের কারণে বিশ্বের দেশগুলোর জিডিপি গড়ে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য এ ক্ষতির পরিমাণ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা গত সপ্তাহে ‘ওয়াটার ফরওয়ার্ড’ নামে একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ চালু করার সময় বলেন, ‘পানি ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করলে কৃষকরা উৎপাদন করতে পারে, ব্যবসায়ীরা কার্যক্রম চালাতে পারে এবং শহরগুলো বিনিয়োগ টানতে পারে। বর্তমান বিশ্বে প্রায় ১৭০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান পানির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও এ খাতে বিনিয়োগ ও কাঠামোগত সংস্কারের অভাব প্রকট।’
বিনিয়োগের অভাব ও ভুল মূল্য নির্ধারণ
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহকদের পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বছরে ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে খাতটি দীর্ঘস্থায়ীভাবে অর্থ সংকটে ভুগছে। এর একটি বড় কারণ হলো পানির ‘ভুল মূল্য নির্ধারণ’।
সরোজ কুমার ঝা মনে করেন, পানির অব্যবস্থাপনা এর প্রকৃত মূল্য ও বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বকে আড়াল করে রাখে। পানি খাতে বর্তমানে অনেক ভর্তুকি দেয়া হয়, বিশেষ করে সেচ ও খাবার পানির ক্ষেত্রে। ধনী ব্যক্তিরা বেশি পানি ব্যবহার করে বলে তারাই এ ভর্তুকির সুবিধা বেশি পাচ্ছে। বৈষম্যমূলক এ ব্যবস্থার কারণে পানি খাতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ বা বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত হচ্ছে না। যেখানে বৈশ্বিক জ্বালানি বা পরিবহন খাতে বিপুল পরিমাণ বেসরকারি বিনিয়োগ আসে, সেখানে পানি খাতটি মূলত রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছে।
পানিকে সম্পদ হিসেবে দেখা
বিশ্বব্যাংক এখন পানি ব্যবস্থাপনার ধরনে আমূল পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। সংস্থাটি পানিকে কেবল একটি জনসেবা হিসেবে না দেখে একে একটি বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। খাতটির বিশাল তহবিলের ঘাটতি মেটাতে বছরে অতিরিক্ত ১৩-১৪ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা বর্তমান ব্যয়ের প্রায় তিন গুণ।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
ফ্রস্ট অ্যান্ড সুলিভানের তথ্যমতে, চলতি দশকের শেষ নাগাদ বিশ্বব্যাপী পানি ও বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনার বাজার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৬০ শতাংশ বা ৫৮ ট্রিলিয়ন ডলার সরাসরি পানি ও মিঠা পানির ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করেছে, চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পানি সংকটকে অবহেলা করলে তা সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে আরো অস্থির করে তুলবে। তাই ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১০০ কোটি মানুষের পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন উন্নয়ন ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মিলে কাজ শুরু করেছে। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ ছাড়া এ বিশাল লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।