ব্যাংক এমডিদের কেপিআই নীতিমালা নিয়ে এবিবি চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিনের প্রতিক্রিয়া

সব মিলিয়ে একটা লিখিত, পরিমাপযোগ্য ও স্বচ্ছ পারফরম্যান্স মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকাটা তো আমি ভালোই বলব। কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে তিন বিষয়ের ওপর— এমডিকে যথেষ্ট কার্যক্ষমতা দিতে হবে; সমস্যায় পতিত ব্যাংকের ক্ষেত্রে আলাদা চিন্তা করতে হবে; আর এই নীতি কার্যকর করার সময় ব্যাংক এমডির ওই ব্যাংকে কাজের ‘অভিজ্ঞতা’কে গুরুত্ব দিতে হবে, নয়তো দক্ষ একজন এমডির প্রতি ন্যায় করা হবে না

বাংলাদেশ ব্যাংকের জারীকৃত নীতিমালাটির বিষয়ে আমার প্রাথমিক মূল্যায়ন ইতিবাচক। ব্যাংকের এমডিদের কর্মদক্ষতা শুধু মুনাফা দিয়ে না, বরং মূলধন, তারল্য, খেলাপি ঋণ, ঋণ আদায়, সুশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, গ্রাহকসেবা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তাসহ বহুমাত্রিক সূচকে পরিমাপ করার উদ্যোগ সময়োপযোগী। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এরই মধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কাঠামো চালু হয়েছে। এই কেপিআই পদ্ধতি সেই বৃহত্তর জবাবদিহিমূলক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে একটা মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি। একজন এমডিকে যে ফলাফলের জন্য জবাবদিহি করা হবে, সেই ফলাফল অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কর্তৃত্বও তার থাকতে হবে। আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখনো অনেক ক্ষেত্রে পর্ষদ এবং ম্যানেজমেন্টের ভূমিকার সীমারেখা যথেষ্ট স্পষ্ট না। যদি কোনো এমডিকে আপনি ঋণের মান, ঋণ আদায়, সুশাসন, ইন্টারনাল কন্ট্রোল, প্রযুক্তি ঝুঁকি কিম্বা মানবসম্পদের মানের জন্য কঠোরভাবে মূল্যায়ন করেন, তখন যদি সেই এমডির এসব বিষয়ে স্বাধীন ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা সীমিত থাকে, তাহলে মূল্যায়নটা ন্যায্য হবে না।

বিশেষ করে সমস্যা আক্রান্ত ব্যাংকের এমডিদের জন্য বিষয়টা তো অনেক সংবেদনশীল। একজন নতুন এমডি এমন একটা ব্যাংকের দায়িত্ব নিতে পারেন যেখানে বহু বছরের জমা হওয়া মন্দঋণ, মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন ঘাটতি, সুশাসন দুর্বলতা বা ধরা যাক সেক্টরভিত্তিক লোন কনসেন্ট্রেশন রিস্ক ইত্যাদি বিদ্যমান। তখন ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে এসব লেগাসি সমস্যায় বড়ো বদল আনা বাস্তবসম্মত না। তাই একই বেঞ্চমার্ক সব ব্যাংকে প্রয়োগ করলে আপনি ওই এমডির যাত্রা শুরুর পয়েন্ট ও ব্যাংকের লেগাসি সমস্যা ও তার নিয়ন্ত্রণের বাইরের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিচ্ছেন না। তখন ভালো একজন পেশাদার ব্যাংকারও সমস্যা-আক্রান্ত কোনো ব্যাংকের দায়িত্ব নিতে উৎসাহিত হবেন না।

আমি মনে করি, এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগে এবিবি-র কিছু অভিজ্ঞ ব্যাংক এমডির সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করলে এই নীতিমালা আরো বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হতে পারত।

সব মিলিয়ে একটা লিখিত, পরিমাপযোগ্য ও স্বচ্ছ পারফরম্যান্স মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকাটা তো আমি ভালোই বলব। কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে তিন বিষয়ের ওপর— এমডিকে যথেষ্ট কার্যক্ষমতা দিতে হবে; সমস্যায় পতিত ব্যাংকের ক্ষেত্রে আলাদা চিন্তা করতে হবে; আর এই নীতি কার্যকর করার সময় ব্যাংক এমডির ওই ব্যাংকে কাজের ‘অভিজ্ঞতা’কে গুরুত্ব দিতে হবে, নয়তো দক্ষ একজন এমডির প্রতি ন্যায় করা হবে না। ব্যাংক চালাতে এমডিদের জবাবদিহি বাড়াটা যেমন দরকার, তেমন পর্ষদের জবাবদিহির বিষয়টাও আমাদের সংস্কৃতিতে অনেক জরুরি।

মাসরুর আরেফিন: চেয়ারম্যান অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) এবং এমডি ও সিইও সিটি ব্যাংক পিএলসি

আরও