কৃষির রূপান্তরে ও বৈচিত্র্যকরণে আধুনিক যন্ত্রাংশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে আধুনিক যন্ত্রাংশের ব্যবহার দিন দিন বাড়লেও এখনো পিছিয়ে স্থানীয় কৃষকরা। আর্থিক সক্ষমতা না থাকা ও পর্যাপ্ত ঋণ সুবিধার অভাব কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বড় বাধা। দেশের কৃষকের মাত্র ২ শতাংশের নিজস্ব কোনো যন্ত্র রয়েছে। বাকি ৯৮ শতাংশই ভাড়ায় কৃষি যন্ত্র ব্যবহার করেন। আর কৃষি যন্ত্রাংশ ক্রয়ে কৃষকের ঋণের মাত্র ২-৭ শতাংশ আসে ব্যাংক থেকে। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই) গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
রাজধানীর বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) গতকাল ‘বাংলাদেশের খাদ্য ব্যবস্থায় অর্থায়ন: প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ ও নীতি সংলাপ’ শীর্ষক সংলাপে গবেষণা প্রবন্ধটি উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে আইএফপিআরআই ও বিআইডিএস।
প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে আইএফপিআরআইয়ের রিসার্চ ফেলো ড. এম মেহরাব বখতিয়ার বলেন, ‘২০১৮ সালে বাংলাদেশে কম্বাইন হারভেস্টারে ফসল কাটার হার ছিল মাত্র ১ শতাংশ, যা বেড়ে ২০২৩ সালে ২০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। দেশের কৃষকের মাত্র ২ শতাংশের নিচে কৃষি যন্ত্রাংশ যেমন পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর বা হারভেস্টারের মতো যন্ত্রাংশ। বাকি কৃষকরা ভাড়ায় যন্ত্রাংশ এনে ব্যবহার করেন।’
আইএফপিআরআইয়ের রিসার্চ ফেলো জানান, প্রতি ১০০ জন কৃষকের মধ্যে ৯৮ জনই ভাড়ায় ট্রাক্টর ব্যবহার করেন। পাওয়ার টিলার ভাড়ায় ব্যবহার করেন ৯৫ শতাংশ। প্রতি ১০০ জন কৃষকের মধ্যে মাত্র ৬ জনের নিজস্ব থ্রেশার মেশিন রয়েছে। সেচের জন্য নিজস্ব টিউবওয়েল আছে ১৪ শতাংশ এবং পাওয়ার পাম্প আছে ১৬ শতাংশ কৃষকের। বাকিরা ভাড়ায় ব্যবহার করেন। এ ভাড়ার বার্ষিক আয় ৩১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
আইএফপিআরআইয়ের জরিপে দেখা গেছে, একটি ট্রাক্টর গড়ে ২৮৫টি ফার্ম, একটি হারভেস্টর গড়ে ১৭০টি ফার্ম এবং প্রতিটি পাওয়ার টিলার ৭০টি ফার্মের সেবা প্রদান করে। অন্যদিকে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে কিংবা কৃষকের নিজস্ব যন্ত্রাংশ না থাকার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা আর্থিক সক্ষমতা ও অর্থায়নের সুবিধা কম থাকার কথা উঠে আসে। যদিও কয়েক বছর ধরে সরকার ভর্তুকি মূল্যে কৃষি যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে।
ড. মেহরাব বখতিয়ার বলেন, ‘কৃষি যন্ত্রাংশ ক্রয়ে যন্ত্রপ্রতি ১ থেকে ৩২ লাখ টাকার মূলধন প্রয়োজন। কিন্তু যন্ত্র ক্রয়ের মাত্র ২-৭ শতাংশ অর্থায়ন আসে ব্যাংক থেকে।’ হারভেস্টার মেশিন ক্রয়ের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘হারভেস্টার মালিকদের অর্থের ৫ শতাংশ এসেছে ব্যাংক ঋণ থেকে। এছাড়া আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ৩২ শতাংশ, ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী বা এনজিও থেকে ২৭ শতাংশ এবং মহাজনের কাছ থেকে ৮ শতাংশ।’
ব্যাংক কেন এ খাতে ঋণ প্রদান থেকে দূরে থাকে তার কারণ সম্পর্কে আইএফপিআরআইয়ের রিসার্চ ফেলো বলেন, ‘কৃষি ঋণ নীতিমালায় অন্যের জমিতে ভাড়া খাটানোর জন্য কেনা যন্ত্র কৃষি ঋণের আওতাভুক্ত নয়। অথচ ৯৯ শতাংশ যন্ত্রই অন্য কৃষকের সেবায় ব্যবহার হয়।’
আরেক উপস্থাপনায় বলা হয়, ২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ঋণে কৃষির অংশ ২৫ থেকে ১৬ শতাংশে নেমেছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, প্রথাগত কৃষির বাইরে গ্রামীণ অর্থনীতি বিকশিত ও রূপান্তর হচ্ছে। দরিদ্র পরিবারগুলোর আয়ের ৪০ শতাংশই ব্যয় করে ঋণের কিস্তি পরিশোধে। এ সময়ে দরিদ্র ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ২২ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকের ফার্ম লোনের ৪৪-৫৬ শতাংশই যায় সার কিনতে, বীজে ৩৫-৪৫ এবং জমি লিজে ব্যয় হয় ১০-১৪ শতাংশ। এছাড়া আরো বলা হয়, দেশের গবাদিপশুর ৯০ শতাংশই ক্ষুদ্র খামারিরা উৎপাদন করেন। এর পরও এ খাতে যাচ্ছে কৃষি ঋণের ৫ শতাংশের কম। ফলে মুনাফার বড় সুযোগ থাকার পরও কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি সচিব মো. সেলিম খান জানান, সরকার কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘দেশের ৪১ শতাংশের বেশি শ্রমশক্তি কৃষিতে যুক্ত। কিন্তু কৃষিকাজে আমরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি। শ্রমিক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে আলোচনায় উঠে এসেছে। ধান কাটার সময় ১-২ হাজার টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না।’
কৃষিতে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা প্রসঙ্গে সচিব বলেন, ‘আমরা দক্ষিণাঞ্চলে সূর্যমুখী চাষের একটা বড় প্রকল্প করেছি, যেখানে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং করা হচ্ছে। সেখানে বেসরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমাদের সঙ্গে কাজ করছে। সরকার কৃষককে সার ও বীজ দেবে। আর তার সঙ্গে কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ে যে প্রতিষ্ঠান থাকবে সে কৃষককে ফসল কেনার নিশ্চয়তা দেবে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের চুক্তি হবে, তারা কৃষকের পণ্য কিনে দেশেই তেল উৎপাদন করবে, রফতানি করতে পারবে না।’
কৃষি সচিব আরো বলেন, ‘কৃষিকে এগিয়ে নিতে হলে যান্ত্রিকীকরণ করতে হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিকীকরণের বিকল্প নেই। কৃষক সব সময় পণ্য উৎপাদন করে কিন্তু সব সময় লাভ ঘরে নিতে পারে না। কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ করতে পারলে কৃষকের মুনাফা বাড়বে, সরকার এসব নিয়ে কাজ করছে।’
বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এ কে এনামুল হকের সভাপতিত্বে সম্মানিত অতিথি ছিলেন পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল কাদের। আরো গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক কাজী ইকবাল এবং আইএফপিআরআইয়ের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. কেট অ্যাম্বলার ও ড. কার্লি ট্র্যাক্টম্যান।