দেশে সরকারি পর্যায়ে বিটুমিন উৎপাদন করে রাষ্ট্রায়ত্ত রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। ইআরএল থেকে উৎপাদিত বিটুমিনের মান ভালো হওয়ায় অবকাঠামো খাতে এর চাহিদা বেশি। তবে এ বিটুমিন সরকারি কাজের বাইরে বিক্রির বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। সেজন্য সরকারি বিটুমিনের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত ও কারসাজি রোধে অনলাইনে আবেদনের মাধ্যমে বিটুমিন বিক্রি শুরু করেছে বিপিসি। তবে এ ব্যবস্থা চালুর পর ঠিকাদারদের বিটুমিন ক্রয়ে আগ্রহ কমে যাওয়ায় গত দুই মাসে বিক্রি কমে গেছে বলে জানিয়েছে বিপিসি।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপিসির সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে বিটুমিনের উৎপাদন থেকে শুরু করে বিতরণ পর্যন্ত পুরো সিস্টেমটি ডিজিটাল হয়েছে। এখন থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিটুমিন সংগ্রহ করতে পারবেন না ঠিকাদাররা। এতে সরকারি বিটুমিন ব্যবসা ও কেনাবেচার অনিয়ম বন্ধ হবে। বিটুমিনের সম্পূর্ণ ডাটাবেজ থাকবে বিপিসির কাছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানায়, তারা ইআরএলের মাধ্যমে আগে বছরে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন বিটুমিন বিক্রি করত। ইআরএলের উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ায় এখন বিক্রি নেমে এসেছে ৫০ হাজার টনের নিচে। আগামী চার অর্থবছরে বিটুমিনের প্রাক্কলিত বিক্রির পরিমাণও গড়ে ৫০ হাজার টন ধরা হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬২ হাজার ৪৪০ টন বিটুমিন বিক্রি হয়েছিল, যেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিক্রি হয়েছে ৪৭ হাজার ৬৫৯ টন। বিপিসি বাজারজাত করলেও এ বিটুমিন উৎপাদন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা অয়েল ও এসএওসিএলের মাধ্যমে বিপিসি এ বিটুমিন বিক্রি করে।
চলতি অর্থবছরের ২৪ মার্চ পর্যন্ত বিপিসি ড্রাম ও বাল্ক মিলিয়ে মোট ৩৯ হাজার ১০৭ টন বিটুমিন বিক্রি করেছে। এর মধ্যে ড্রামে ১৩ হাজার ৯৫ টন ও বাল্ক বিটুমিন বিক্রি হয়েছে ২৬ হাজার ১৩ টন। ৮০-১০০ গ্রেডের ২৮ হাজার ৬২ টন এবং ৬০-৭০ গ্রেডের ১১ হাজার ৪৪ টন। দুই গ্রেড মিলিয়ে পদ্মা অয়েল ৭ হাজার ৭৪৫ টন, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ৯ হাজার ৫৮৪ টন, যমুনা অয়েল ৯ হাজার ৯২৭ টন, এসএওসিএল ৬ হাজার ৭৭৩ টন এবং অন্যান্য কোম্পানি ৫ হাজার ৭৮ টন বিক্রি করেছে। দেশে প্রতি বছর গড়ে ৪ দশমিক ৫ থেকে পাঁচ লাখ টনের মতো বিটুমিনের চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর।
সরকারি বিটুমিনের মান ভালো হওয়ায় অবকাঠামো নির্মাণে এর চাহিদা বেশি। আগে ঠিকাদাররা ম্যানুয়ালি কাগজপত্র জমা দিয়ে বিটুমিন সংগ্রহ করতেন, যেখানে চাহিদার অতিরিক্ত বিটুমিন উত্তোলন, হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। এসব রোধে বিপিসি অনলাইনে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় এবং ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে অনলাইনে অর্ডার ও ডেলিভারি কার্যক্রম শুরু করে।
৪ ফেব্রুয়ারি বিপিসি চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে ইআরএলের বিটুমিন উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সিদ্ধান্ত হয় যে ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে অনলাইনে অর্ডার ও ডেলিভারি শুরু হবে এবং ৬ ফেব্রুয়ারির পর ম্যানুয়াল আবেদন গ্রহণ করা হবে না।
এ বিষয়ে বিপিসির ব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মো. আল-আমীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন বিটুমিন ক্রয় ও বিক্রয় অনলাইনে হচ্ছে। আগে ওয়ার্ক অর্ডার থাকলে বিটুমিন দেয়া হতো, তবে নানা হয়রানির শিকার হতেন ক্রেতারা। এখন নিবন্ধিত ঠিকাদাররা অনলাইনে চাহিদাপত্র জমা দিচ্ছেন এবং কোম্পানিগুলো সরাসরি তাদের কাছে বিটুমিন সরবরাহ করছে।’
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, অনলাইনে আবেদন শুরুর পর ঠিকাদারদের আবেদন কমেছে। কেউ কেউ অপ্রয়োজনীয় বিটুমিন নিতে চাইছেন না, আবার অনেকেই নতুন সিস্টেম বুঝতে সময় নিচ্ছেন। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকায় ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদিত বিটুমিনের চাহিদা বেশি। তবে এ উত্তোলন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।
ঠিকাদার পর্যায়ে বিটুমিন সরবরাহের জন্য বিপণন কোম্পানিগুলোতে (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও এসএওসিএল) কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কমিটি থাকলেও সরবরাহ নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। বিপিসি ও বিপণন কোম্পানির কর্মকর্তারা ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এ সিন্ডিকেট নির্দিষ্ট সময়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, ভুয়া সরকারি কার্যাদেশ দেখিয়ে অতিরিক্ত বিটুমিন উত্তোলন করে এবং পরে তা চড়া দামে বিক্রি করে।
সাধারণ ঠিকাদাররা সিন্ডিকেটের বাইরে থেকে বিটুমিন উত্তোলন করতে পারেন না। বড় ঠিকাদাররা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের সদস্য হন এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। ওয়ার্ক অর্ডারে নির্ধারিত মানের বিটুমিনের পরিবর্তে নিম্নমানের আমদানীকৃত বিটুমিন ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে এসব অনিয়ম চলত, কিন্তু অনলাইনে সরবরাহ ব্যবস্থা ডিজিটাল হওয়ায় স্বচ্ছতা আসবে ও সঠিক তথ্য সংরক্ষণ নিশ্চিত হবে। এখন অনলাইনে আবেদন করার পর মূল ওয়ার্ক অর্ডার যাচাই করে বিটুমিন সরবরাহ করা হচ্ছে। নতুন ডিজিটাল সফটওয়্যার চালুর ফলে সিন্ডিকেট করে অতিরিক্ত বিটুমিন উত্তোলন সম্ভব হবে না এবং বিটুমিনের অবৈধ বিক্রি বন্ধ হবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিটুমিন অনলাইনে বিক্রির যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা কার্যকর। এতে বিটুমিন নিয়ে বিভিন্ন কারসাজি বন্ধ হবে। তবে ফেব্রুয়ারিতে নতুন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় ঠিকাদারদের মধ্যে অনাগ্রহ দেখা গেছে। আশা করছি, শিগগিরই সব ঠিক হয়ে যাবে।’