এশিয়ার স্বর্ণ উত্তোলনকারী দেশগুলো নিজেদের মজুদ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে স্বর্ণ পরিশোধনের সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে। মূলত ডলারের ওপর আস্থা কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির কারণে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এ কৌশল নিচ্ছে। বিশ্লেষকেরা এ প্রবণতাকে ‘সম্পদ জাতীয়তাবাদ’ বা ‘রিসোর্স ন্যাশনালিজম’ হিসেবে দেখছেন। এর অংশ হিসেবে এশিয়ার স্বর্ণ উত্তোলনকারী দেশগুলো এখন স্বর্ণের অপরিশোধিত আকরিক বিদেশে পাঠানোর বদলে দেশেই পরিশোধনের দিকে ঝুঁকছে। পাশাপাশি স্বর্ণ রফতানিতে কর আরোপ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে স্বর্ণ কেনার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই স্বর্ণের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গিয়েছে। প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ২০০৮ সালে প্রথম ১ হাজার ডলার অতিক্রম করেছিল, যা ২০২০ সালে ২ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা রেকর্ড গড়ে প্রতি ট্রয় আউন্স ৫ হাজার ৫০০ ডলারের ওপরে ওঠে। বিশ্ববাজারে সম্প্রতি দামে সামান্য সংশোধনের পর প্রতি ট্রয় আউন্স ৪ হাজার ১১০ ডলারের কাছাকাছি থাকলেও তা ঐতিহাসিক মানদণ্ডে এখনো বেশ উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে।
অতীতে এশিয়ার যেসব দেশ খনি থেকে উত্তোলন করা আকরিক স্বর্ণ কম দামে রফতানি করত, তারাই এখন ভূগর্ভস্থ সম্পদের প্রকৃত মান বুঝতে শুরু করেছে। এতদিন স্থানীয় পর্যায়ে পরিশোধনাগার না থাকায় অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে স্বর্ণের আকরিক নামমাত্র দামে রফতানি হতো, এমনকি পাচারও হয়ে যেত। দেশগুলো এখন জাতীয় সম্পদ সুরক্ষায় রফতানি কমিয়ে দেশে স্বর্ণের বাজার তৈরির পরিকাঠামো তৈরি করছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওস এ নীতির অন্যতম উদাহরণ। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল ও মেটালস ফোকাসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে লাওস ১২ টন আকরিক স্বর্ণ উত্তোলন করে, যা এশিয়ার ষষ্ঠ সর্বোচ্চ। দেশটিতে সম্ভাব্য মজুদ রয়েছে ৫০০ থেকে ১ হাজার টন। দেশটি বর্তমানে আকরিক বিদেশে না পাঠিয়ে স্থানীয়ভাবেই রিফাইনারি স্থাপন করছে। উত্তোলিত এ বিপুল স্বর্ণ দেশেই মজুদ করতে ২০২৪ সালে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘লাও বুলিয়ান ব্যাংক’। এর মাধ্যমে দেশটি বর্তমানে স্বর্ণ প্রক্রিয়াজাত অবকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারণ করছে।
লাওসের প্রধানমন্ত্রী সোনেক্সে সিফানডোন সেপ্টেম্বরের শুরুতে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘অর্থনীতিকে মজবুত ভিত্তি দিতে স্বর্ণ শিল্পের বিকাশকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।’
বিশ্বের ১০ম শীর্ষ স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়াও মূল্যবান ধাতুটির রফতানি কমাতে উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটি বছরে ১০০ টনের বেশি স্বর্ণ উত্তোলন করে। তবে স্থানীয় বিনিয়োগের চাহিদা বাড়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। এ কারণে ২০২৬ সাল থেকে স্বর্ণ রফতানিতে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ কর আরোপ করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ স্বর্ণ উত্তোলনকারী চীনও একই নীতি অনুসরণ করছে। দেশটি বার্ষিক ৩৮০ টনের বেশি স্বর্ণ উৎপাদন করে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ। তা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বিশাল চাহিদার কারণে দেশটি স্বর্ণ আমদানি করে এবং রফতানিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে। এছাড়া দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’ রিজার্ভের জন্য ক্রমাগত স্বর্ণ কিনছে। চলতি বছরের আগস্টে সংস্থাটি আরো ২০ টন স্বর্ণ কিনেছে। এর ফলে টানা ২২ মাস স্বর্ণ কেনার ধারা অব্যাহত রয়েছে দেশটির।
শুধু এশিয়া নয়, আফ্রিকার দেশগুলোতেও খনিজ সম্পদ রক্ষার এ প্রবণতা বিদ্যমান রয়েছে। মাদাগাস্কারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২০ সাল থেকে রিজার্ভ বাড়াতে দেশের ভেতরে উত্তোলিত স্বর্ণ ক্রয় করছে। একই সঙ্গে আফ্রিকার অন্যতম প্রধান স্বর্ণ উত্তোলনকারী দেশ ঘানা অবৈধ স্বর্ণ খনি বন্ধ ও দেশে সম্পদ ব্যবহারের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডলারের ওপর বৈশ্বিক অর্থনীতির অতিরিক্ত নির্ভরতা কমে আসা এ প্রবণতার অন্যতম প্রধান কারণ। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বিভিন্ন দেশের ডলার সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা ফ্রিজ হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুদ্রাটির ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত নিরাপদ সম্পদ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে স্বর্ণের কদর দিন দিন বাড়ছে।
খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এশীয় ও আফ্রিকান উৎপাদক দেশগুলো যদি নিজেদের স্বর্ণ রিজার্ভে রাখা বাড়িয়ে দেয় এবং বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমায়, তবে মধ্য থেকে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম আরো বাড়তে পারে।