ফলে দেশটিতে বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১১ বিলিয়ন বা ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। প্রতারকরা সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলতে এবং ভুয়া বিনিয়োগ সাইটে ডিজিটাল মুদ্রা, বিশেষ করে ‘স্টেবলকয়েন’ পাঠাতে বাধ্য করতে বেশ উন্নত এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধের সংখ্যা অনেক বেশি বেড়েছে।
মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রিপ্টোকারেন্সি জালিয়াতি ও এর সঙ্গে জড়িত অন্য অপরাধে মোট ক্ষতির পরিমাণ এক বছরে ৬৬ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ১৩৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে শুধু ক্রিপ্টো বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রতারণাই ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৭২০ কোটি ডলার। এ ধরনের মামলায় ভুক্তভোগীদের প্রথমে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে প্রলুব্ধ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হয়।
জেনারেটিভ এআই টুলের ব্যবহার এ ধরনের প্রতারণাকে আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং শনাক্ত করা কঠিন করে তুলেছে। অপরাধীরা বিভিন্ন ভাষায় স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্য কথোপকথন তৈরি করতে এআই ব্যবহার করছে। এমনকি ভিডিও কলের সময় তারা উন্নত এআই ফিল্টার ব্যবহার করে নিজেদের চেহারা পরিবর্তন করছে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রতারকরা এআই প্রযুক্তির সঙ্গে চুরি করা ব্যক্তিগত তথ্য মিলিয়ে অফিশিয়াল ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জগুলোর কঠোর পরিচয় যাচাইকরণ প্রক্রিয়াও ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের একটি সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে এ অপরাধ চক্রের কার্যপদ্ধতি স্পষ্ট হয়। সেখানকার একজন নারী টিন্ডার নামের একটি ডেটিং অ্যাপে মার্টিন নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হন। ওই ব্যক্তি নিজেকে একজন আর্থিক উপদেষ্টা হিসেবে দাবি করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ওই নারীকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ করতে রাজি করান। সরাসরি কখনো দেখা না হলেও ওই নারী তাকে বিশ্বাস করেন এবং একটি ওয়েবসাইটে মার্কিন ডলারের সমমূল্যের স্টেবলকয়েন ‘টেথার’-এর মাধ্যমে ৫ লাখ ডলার স্থানান্তর করেন। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, বিনিয়োগের ওই প্লাটফর্মটি সম্পূর্ণ ভুয়া ছিল এবং টাকা নিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
তদন্তকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে, এ ধরনের বড় চক্র মূলত মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া সীমান্ত এলাকায় অবস্থানকারী চীনের অপরাধী চক্র দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এ চক্রগুলো ভালো বেতনের প্রযুক্তিগত চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কর্মীদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিয়ে আসে। সেখানে পৌঁছানোর পর কর্মীদের পাসপোর্ট কেড়ে নেয়া হয় এবং তাদের বন্দি করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের লক্ষ্য করে প্রতারণা চালাতে বাধ্য করা হয়। প্রতারকরা জেপি মরগানের মতো বড় মার্কিন ব্যাংক বা নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তা সেজে কথা বলার জন্য আগে থেকে তৈরি স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানান, অপরাধীরা এ লেনদেনের জন্য টেথারের মতো স্টেবলকয়েন বেশি পছন্দ করে। যেহেতু স্টেবলকয়েনের মূল্য সরাসরি ডলারের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাই অন্য ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো এতে হঠাৎ দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না। ফলে চুরি করা অর্থের সঠিক মূল্য বাজারের ওঠানামা থেকে নিরাপদ থাকে। এ ক্রমবর্ধমান সংকট এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নেই, জাপানেও ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংক্রান্ত জালিয়াতির মামলা প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। এআই পরিচালিত ক্রিপ্টো প্রতারণা এখন একটি বড় বৈশ্বিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।