পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় অপতথ্য, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ও ডিজিটাল প্রতারণা সম্পর্কে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টরা। বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬-এর ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি (ডিএসই) ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ডিজিটাল ডেসেপশন অ্যান্ড স্ক্যাম অ্যালার্ট’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির কমিশনার তানবীর হাবিব রহমান, নাহিদ মাহতাব, মো. নাফিজ আল তারিক এবং হোসাইন সাহাদত ও ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম। এছাড়াও অনুষ্ঠানে সাইফুল ইসলামের সঞ্চালনায় এক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এর ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফুর রহমান, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশের (আইসিএসবি) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শাহজাহান এবং সিএফএ সোসাইটির সভাপতি মাহতাব ওসমানী।
ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং ক্যাপিটাল মার্কেটের ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে ডিজিটাল ডিসইনফরমেশন ও স্ক্যাম শক্তহাতে দমন করতে হবে। পুঁজিবাজারে নেতিবাচক খবরের ছড়াছড়ি এবং সঠিক প্রচারণার অভাবের কারণেও অনেক সময় ম্যানিপুলেটররা সুযোগ নেয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএসইর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আবু নুর মোহাম্মদ হাসানুল করিম। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া বিনিয়োগ গ্রুপ, প্রতারণামূলক লেনদেন প্লাটফর্ম, পরিচয় জালিয়াতি, ফিশিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করার বিভিন্ন কৌশল তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের কর্মসূচি শেষ হলেও বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা ও সুরক্ষার কার্যক্রম সারা বছর অব্যাহত রাখতে হবে। পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের বিকাশ, লাইসেন্সপ্রাপ্ত মিউচুয়াল ফান্ড এজেন্ট ও আর্থিক পরামর্শক তৈরির উদ্যোগ, আইপিও নীতিমালার সংস্কার, সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধিমালা এবং নতুন বিনিয়োগপণ্য চালুর বিষয়ে কাজ চলছে।’
পাশাপাশি টি+১ সেটলমেন্ট ও স্ক্রিপ নেটিং চালুর বিষয়েও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে পুঁজিবাজারের কার্যক্রম ও বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।
গণমাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তথ্যের যথার্থতা, প্রেক্ষাপট ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের নিজেদের বিনিয়োগ সম্পর্কে শেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। বিনিয়োগকারীকে শেখার সুযোগ করে দেয়া গেলেও অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগানোর দায়িত্ব তার নিজের।’
বিএসইসির কমিশনার হোসাইন সাদাত বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা ও সুরক্ষার বিষয়টি শুধু একটি সপ্তাহের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আর্থিক মধ্যস্থতাকারী, বিনিয়োগকারী ও পেশাজীবীদের সারা বছর সচেতন ও দায়িত্বশীল থাকার বার্তা দেয়। পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা, স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জ্ঞান অর্জন, সঠিক উপলব্ধি ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।’
বিএসইসির কমিশনার মো. নাফিজ আল তারিক আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত বার্নি ম্যাডফের পঞ্জি স্কিমের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ‘প্রতারণামূলক বিনিয়োগ স্কিম সবসময় অস্বাভাবিক উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিচালিত হয় না। কখনো কখনো ধারাবাহিক ও স্থিতিশীল মুনাফা দেখিয়েও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হয়। বাজারের ওঠানামা সত্ত্বেও কোনো বিনিয়োগে নিয়মিত ইতিবাচক মুনাফা দেখানো হলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রকৃত উৎস যাচাই করা জরুরি।’
বিএসইসির কমিশনার অ্যাডভোকেট নাহিদ মাহতাব বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। দ্রুত বড়লোক হওয়ার প্রবণতা ও লোভকে কাজে লাগিয়ে প্রতারকরা বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলছে। তাই অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও দাবি যাচাই না করে কোনো আর্থিক লেনদেন করা উচিত নয়।’
সমাপনী বক্তব্যে সাইফুল ইসলাম পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত বিক্রয়চাপ এড়াতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
সাইফুল ইসলাম জানান, পুঁজিবাজারে সহায়তার জন্য আগে অনুমোদিত ২০০ কোটি টাকার বরাদ্দ বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। আইপিওর ক্ষেত্রে আর্থিক বিবরণীর ১২০ দিনের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবও দেন ডিবিএ প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ‘নতুন আইপিও বিধিমালার অপেক্ষায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ নিরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন।’
এ কারণে আর্থিক বিবরণীর মেয়াদ ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৮০ দিন করা এবং নতুন আইপিও বিধিমালার প্রেক্ষাপটে সাময়িক ছাড় দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।’