চলতি ২০২৫ সাল

দেড় দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী উল্লম্ফনের দেখা পেয়েছে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর পুঁজিবাজার

এমএসসিআই সূচকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর শেয়ারবাজারের সূচক বেড়েছে ২৮ শতাংশ, যা ২০০৯ সালের পর সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি। আর স্থানীয় মুদ্রায় ইস্যুকৃত সরকারি বন্ডের জেপিমরগ্যান সূচকও বেড়েছে ১৬ শতাংশ। এর বিপরীতে উন্নত অর্থনীতির শেয়ারবাজার পরিমাপকারী এমএসসিআই সূচক চলতি বছরে এখন পর্যন্ত বেড়েছে ১৭ শতাংশেরও কম। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এখন মার্কিন বাজারের ছায়া থেকে ক্রমেই বেরিয়ে আসছে। বিষয়টি তারই ইঙ্গিতবাহী।

ডলারের অবমূল্যায়ন ও আকর্ষণীয় দরে কেনাবেচার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা। এতে গত নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) প্রায় ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী উল্লম্ফনের দেখা পেয়েছে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর শেয়ারবাজার। খবর এফটি।

এ নয় মাসে পুঁজিবাজারে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বেশ শক্তিশালী উত্থানের দেখা পেয়েছে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো। এমএসসিআই সূচকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর শেয়ারবাজারের সূচক বেড়েছে ২৮ শতাংশ, যা ২০০৯ সালের পর সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি। আর স্থানীয় মুদ্রায় ইস্যুকৃত সরকারি বন্ডের জেপিমরগ্যান সূচকও বেড়েছে ১৬ শতাংশ। এর বিপরীতে উন্নত অর্থনীতির শেয়ারবাজার পরিমাপকারী এমএসসিআই সূচক চলতি বছরে এখন পর্যন্ত বেড়েছে ১৭ শতাংশেরও কম। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এখন মার্কিন বাজারের ছায়া থেকে ক্রমেই বেরিয়ে আসছে। বিষয়টি তারই ইঙ্গিতবাহী।

বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিষয়টি গত দেড় দশকের স্বাভাবিক ধারার পুরোপুরি বিপরীত। ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মার্কিন শেয়ারবাজারের উত্থানকে দেখা হয়েছে ‘বুল রান’ হিসেবে। এ সময় উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর পুঁজিবাজার অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে। উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর শেয়ারবাজার ২০০১ সালের পর বড় এক উত্থানের মধ্য দিয়ে যায়। ২০০৭-০৮ সালের মহামন্দায় তা ধসে পড়ে। এর পর বিগত দেড় দশকে চক্রাকারে উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে উদীয়মান বাজারগুলোর সূচক বেড়েছে মাত্র ৯ শতাংশেরও কম।

এ বিষয়ে ফিয়েরা ক্যাপিটালের সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার ইয়ান সিমনস বলেন, ‘১৫ বছর মাঝারি মানের পারফরম্যান্স দেখানোর পর পরিস্থিতি অবশেষে উদীয়মান বাজারগুলোর অনুকূলে এসেছে। এক্ষেত্রে মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে মুদ্রাবাজারে ডলারের পারফরম্যান্স। পরিকল্পিতভাবে হোক বা কাকতালীয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডলারকে দুর্বল রাখার পথ তৈরি করেছেন।’

ডলারের অবমূল্যায়ন সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক চাপ কমায়। কারণ এতে ডলারভিত্তিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করা দেশগুলোর জন্য সাশ্রয়ী হয়। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাতে শুরু করায় এসব দেশে এখন স্থানীয় মুদ্রায় বন্ডে বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে, যেগুলোর প্রকৃত রিটার্ন মূল্যস্ফীতির সমন্বয়ের পরও তুলনামূলক বেশি।

প্রিন্সিপাল ফিনিস্টারের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ডেমিয়ান বুশে বলেন, ‘এ বছর জেপিমরগ্যানের স্থানীয় বন্ড সূচকে যত মুনাফা হয়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই এসেছে মুদ্রাবাজারে পরিবর্তনের কারণে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন সুদহার কমানোর পথে। আর ডলারে অবমূল্যায়নের ধারা বজায় রয়েছে।’

বড় উদীয়মান অর্থনীতি যেমন ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখনো সুদহার কমানোর বিষয় সতর্ক অবস্থান অবলম্বন করছে। ফলে প্রকৃত রিটার্ন বা ‘রিয়েল ইল্ড’ তুলনামূলক বেশি থাকছে। আবার তুরস্কের মতো ভঙ্গুর অর্থনীতিগুলোয় মূলধন আকর্ষণের তাগিদে দ্বিগুণ অংকের সুদ বজায় রাখা হয়েছে।

এমনকি থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো নিম্ন সুদহারের অর্থনীতিতেও মূল্যস্ফীতি কমায় স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের কাছে বন্ডের আকর্ষণ রয়ে গেছে। ২০১৬ সালের পর এবারই স্থানীয় মুদ্রায় বন্ডের বাজারে সবচেয়ে বড় উত্থান দেখা যাচ্ছে। যদিও আর্জেন্টিনার ঋণ সংকট থেকে বেরিয়ে আসা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

চীনের বাইরে ১৭টি বড় উদীয়মান অর্থনীতিতে স্থানীয় মুদ্রায় সরকারি বন্ড ইস্যুর পরিমাণ এ বছর রেকর্ড ২৮৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। উচ্চ রিটার্নে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে এ বিপুল পরিমাণ বন্ড ইস্যু করা হয়েছে বলে মনে করছেন এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের এমার্জিং মার্কেটস ক্রেডিট রিসার্চ বিভাগের প্রধান জাহাবিয়া গুপ্ত।

অন্যদিকে, উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর শেয়ারবাজারে এআইর উত্থানসৃষ্ট উদ্দীপনাকে বড় করে তুলছেন বিনিয়োগকারীরা। বিশেষ করে যেসব দেশ চিপ উৎপাদনে নেতৃত্ব দিচ্ছে, সেগুলোয় এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বেশি। যদিও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিনিয়োগ যত বাড়ছে, তার চাহিদা ততটা টেকসই নাও হতে পারে।

চিপ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও ডাটা সেন্টারের যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোয় বিনিয়োগের বড় ধরনের ঢেউ দেখা যাচ্ছে। এর প্রভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি ও তাইওয়ানের তাইএক্স সূচক রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। আর বিশ্বের বৃহত্তম চিপ নির্মাতা তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির (টিএসএমসি) শেয়ারদর বেড়ে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন এটি এমএসসিআই সূচকের প্রায় ১১ শতাংশ জুড়ে রয়েছে। এ হার অন্য যেকোনো দেশের মোট শেয়ারের চেয়েও বেশি।

ফান্ড ম্যানেজারদের ভাষ্যমতে, উদীয়মান বাজারে বিনিয়োগকারীদের এ উত্থানে বড় প্রভাব রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি। অস্থিতিশীল ও বিভ্রান্তিপূর্ণ নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে দেশটি এখন নিজেই অনেকাংশে উদীয়মান অর্থনীতির মতো আচরণ করছে।’

এ বিষয়ে এক ফান্ড ম্যানেজার বলেন, ‘উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়টিতেই যখন উদীয়মান বাজারের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তখন বিনিয়োগকারীরা বিকল্প খুঁজতে শুরু করে।’

এ বছর উদীয়মান বাজারে শেয়ারবাজারের উত্থানের আরেকটি বড় প্রভাব রেখেছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর ‘রি-রেটিং’। অর্থাৎ কোম্পানিগুলোর শেয়ারমূল্য তাদের সম্ভাব্য আয়ের তুলনায় বাড়ছে। এর পরেও মার্কিন পুঁজিবাজারের তুলনায় এগুলোয় বিনিয়োগ এখনো সস্তা। মার্কিন শেয়ারবাজারে এমএসসিআই সূচকের শেয়ারগুলো এসব কোম্পানির আগামী বছরের সম্ভাব্য আয়ের ১৪ গুণ দরে লেনদেন হচ্ছে। যেখানে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে এর পরিমাণ প্রায় ২৩ গুণ।

উইলিয়াম ব্লেয়ারের পোর্টফোলিও ম্যানেজার ভিভিয়ান লিন থারস্টন বলেন, ‘এ বছর উদীয়মান বাজারের পারফরম্যান্সের মূল কারণ হচ্ছে রি-রেটিং। যুক্তরাষ্ট্র ও বাকি বিশ্বের মধ্যে মূল্যায়নে বিশাল ব্যবধান রয়েছে, যা এখনো বজায় আছে। কারণ মার্কিন শেয়ারবাজার দীর্ঘদিন ধরেই অতিমূল্যায়িত হচ্ছে।’

তবে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ভারতীয় পুঁজিবাজার এ উত্থানের দিক থেকে এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে। কারণ দেশটির শেয়ারবাজারে কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর আগেই অনেক বেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্যায়ে পৌঁছেছিল। যদিও দেশটির করপোরেট আয় প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

তবে এখনো এ প্রবল উত্থানের বিপরীতে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর শেয়ারবাজারে অর্থপ্রবাহ অনেক কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও