হোম লোন দেয়ার ক্ষেত্রে আপনাদের পণ্যগুলো কী? কত শতাংশ সুদে গ্রাহকরা ঋণ পাচ্ছেন?
দেশের আবাসন খাতে বিনিয়োগ ও ব্যক্তি পর্যায়ে গৃহনির্মাণ বা ফ্ল্যাট ক্রয় আরো সহজ করতে ব্যাংক এশিয়া গ্রাহকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের হোম লোন ও হোম ইনভেস্টমেন্ট প্রডাক্ট চালু রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বপ্নের নির্মাণ (বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন), স্বপ্নের আবাস (ফ্ল্যাট ক্রয়), নিজের বাড়ি (টেকওভার লোন/বিনিয়োগ), গৃহসাজ (হোম রিনোভেশন), স্বপ্নের কুটির (সেমিপাকা বিল্ডিং নির্মাণ) ও এইচপিএসএম রিয়েল এস্টেট/হাউজিং (ইসলামিক হোম ইনভেস্টমেন্ট)।
গ্রাহকদের পছন্দ ও চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংক এশিয়া কনভেনশনাল ব্যাংকিংয়ের আওতায় হোম লোন সেবা ও ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের আওতায় হোম ইনভেস্টমেন্ট সেবা দিচ্ছে। ইসলামিক ব্যাংকিং ফাইন্যান্সের আওতায় গ্রাহকরা বর্তমানে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ মুনাফা হারে হোম ইনভেস্টমেন্ট সুবিধা পাচ্ছেন। আর কনভেনশনাল ফাইন্যান্সে হোম লোনের সুদহার বর্তমানে ১১ দশমিক ৫০ থেকে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
ফ্ল্যাট ক্রয় বা বাড়ি নির্মাণে ঋণের আবেদন করলে গ্রাহক সেটি কতদিনের মধ্যে পান?
এক্ষেত্রে ব্যাংক এশিয়া নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই গ্রাহকদের ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা দিয়ে থাকে। ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটি যদি ব্যাংকের সঙ্গে ভেটিংকৃত হয় এবং গ্রাহক প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র যথাযথভাবে দাখিল করেন তাহলে সাধারণত তিন থেকে সাত কার্যদিবসের মধ্যেই ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ সম্পন্ন করা যায়। অন্যদিকে বাড়ি নির্মাণ ঋণ বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ কার্যদিবস প্রয়োজন হয়। কারণ ঋণ অনুমোদনের আগে লিগ্যাল ভেটিং, সম্পত্তির মূল্যায়ন, দলিলপত্র, বিল্ডিং প্ল্যান এবং আবেদনকারীর আয়সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করা হয়।
এ ঋণের মেয়াদ কতদিনের হয় এবং সুদহার নির্ধারিত না ভাসমান?
হোম লোন এবং হোম ইনভেস্টমেন্টের মেয়াদ গ্রাহকের প্রয়োজন ও পরিশোধ সক্ষমতা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। সাধারণত এ মেয়াদ সর্বনিম্ন এক বছর থেকে সর্বোচ্চ ২৫ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সুদ বা মুনাফার হার নির্ধারিত নয়, বরং বাজারভিত্তিক ভাসমান (ফ্লোটিং) পদ্ধতিতে করা হয়। দীর্ঘমেয়াদ ও ভাসমান হারের সুবিধা গ্রাহকদের মাসিক কিস্তির চাপ তুলনামূলকভাবে কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
সুদের হার বাজারদরের সঙ্গে ওঠানামা করায় গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে—এক্ষেত্রে আপনাদের ব্যাখ্যা কী?
ভাসমান সুদহার একটি বাস্তবসম্মত, স্বচ্ছ ও বাজারভিত্তিক অর্থায়ন পদ্ধতি। ব্যাংকের আমানতের সুদ কিংবা মুনাফার হার পরিবর্তিত হলে তার সঙ্গে ঋণের সুদ বা বিনিয়োগের মুনাফার হারও পরিবর্তিত হবে—এটাই স্বাভাবিক। এ পদ্ধতির মাধ্যমে অর্থায়ন কার্যক্রমে বাজার বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটে এবং দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহক ও ব্যাংক উভয়ের জন্যই একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং টেকসই অর্থায়ন কাঠামো নিশ্চিত হয়। এতে একদিকে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা সহজ হয়, অন্যদিকে গ্রাহকরাও সময়ের সঙ্গে বাজার সুবিধা পান।
ফ্ল্যাট ক্রয়ে কত টাকা পর্যন্ত ঋণ এবং কোন শ্রেণীর গ্রাহককে অগ্রাধিকার দেন?
গ্রাহকদের ঋণ ও বিনিয়োগ সুবিধা প্রদানে ব্যাংক এশিয়া সবসময়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করে। বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী, ফ্ল্যাট ক্রয়ে গ্রাহকরা সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা পেতে পারেন। স্থায়ী আয়সম্পন্ন, নিয়মিত কিস্তি পরিশোধে সক্ষমতা এবং ভালো ক্রেডিট হিস্ট্রি রয়েছে—এমন গ্রাহকরা স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকার পান। তবে যথাযথ কাগজপত্র এবং বৈধ আয়ের উৎস নিশ্চিত করা গেলে সব শ্রেণীর গ্রাহককেই ব্যাংক এশিয়া এ সেবা দিতে আগ্রহী।
পর্যাপ্ত জামানত থাকায় হোম লোন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বীকৃত। তার পরও দেশের ব্যাংকগুলো এ ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহী নয় কেন?
আবাসন খাতে পর্যাপ্ত কোলাটেরাল (জামানত) থাকায় হোম লোন স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকের জন্য একটি নিরাপদ বিনিয়োগ। এর পরও কিছু বাস্তবসম্মত কারণে ব্যাংকগুলো এ ধরনের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো হোম লোনের দীর্ঘমেয়াদ। সাধারণত ১০-২৫ বছরের মেয়াদে দেয়া হয়, অথচ ব্যাংকের অধিকাংশ আমানত সাধারণত স্বল্পমেয়াদি। হোম লোনে দীর্ঘ সময়ের জন্য অর্থ আটকে থাকায় ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি হয়। এছাড়া জমির মালিকানা ও দলিলের সঠিকতা যাচাই একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।
হোম লোনে আপনাদের খেলাপির হার কেমন? এক্ষেত্রে কোন শ্রেণীর গ্রাহকরা বেশি খেলাপি হচ্ছেন?
সামগ্রিক ব্যাংক খাতের তুলনায় আমাদের হোম লোনের খেলাপির হার সন্তোষজনকভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকদের ক্রেডিট হিস্ট্রি, কিস্তি দেয়ার সক্ষমতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি রিপোর্ট গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হয়। এ কারণেই হোম লোন খাতে খেলাপির হার তুলনামূলকভাবে কম রাখা সম্ভব হয়েছে।
হোম লোন খাতের সম্প্রসারণে নীতিগত কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কি?
এ খাতে এখনো কিছু নীতিগত ও কাঠামোগত প্রবিন্ধকতা রয়ে গেছে। এখানে ফ্ল্যাট বা জমি রেজিস্ট্রেশনের ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি। এ কারণে সাধারণ গ্রাহক অনেক ক্ষেত্রে আবাসন ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হন। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা ও ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ পলিসি অনুযায়ী বর্তমানে গ্রাহকদের সম্পত্তির মোট মূল্যের অন্তত ৩০ শতাংশ নিজস্ব অর্থায়নে নিশ্চিত করতে হয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত গ্রাহকের পক্ষে এককালীন এ অর্থ জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা হোম লোন গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় বাধা।
দীর্ঘমেয়াদি রিফাইন্যান্সিং স্কিমও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ে ‘অর্থঋণ আদালত’ বিদ্যমান থাকলেও এর কার্যক্রম অনেক সময় দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি হোম লোনের সর্বোচ্চ সীমা ৪ কোটি টাকায় উন্নীত করেছে। এ সিদ্ধান্ত বাজারে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে?
বর্তমানে রড, সিমেন্ট ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। ফলে বড় পরিবারের জন্য বা ভালো লোকেশনে ২ কোটি টাকার মধ্যে ফ্ল্যাট কেনা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ছিল। সর্বোচ্চ সীমা ৪ কোটি টাকা করায় এখন গ্রাহকরা বড় ফ্ল্যাট বা প্রিমিয়াম লোকেশনে কেনার সুযোগ পাবেন।
আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নিলে হোম লোনের বাজার সম্প্রসারণ সহজ হবে?
এক্ষেত্রে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া অত্যাবশ্যক। যেমন প্রতিটি প্রকল্পের জমির মালিকানার দলিল এবং রাজউক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নকশা অনুমোদনের কাগজপত্র সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও স্বচ্ছ রাখা। অনেক ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট হস্তান্তরে দেরি হওয়ায় গ্রাহকের কিস্তি পরিশোধে সমস্যা দেখা দেয়। আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সময়মতো ফ্ল্যাট হস্তান্তর নিশ্চিত করেন, তবে গ্রাহক ও ব্যাংক উভয়ই ঝুঁকিমুক্ত থাকে। বর্তমানে বড় ফ্ল্যাটের চেয়ে মধ্যবিত্তের জন্য ‘অ্যাফোর্ডেবল হাউজিং’-এর চাহিদা বেশি। প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট ও মাঝারি মানের ফ্ল্যাট তৈরিতে গুরুত্ব দিলে ঋণের গ্রাহক উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিজ নিজ সুবিধামতো ব্যাংকের সঙ্গে আগে থেকে বিশেষ চুক্তি করে রাখেন, তাহলে গ্রাহকরা কম সময়ে এবং সহজ শর্তে ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা নিতে পারবেন। আবাসন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের সমন্বিত উদ্যোগে হোম লোন খাত আরো বিস্তৃত ও সহজলভ্য হয়ে উঠবে।