বকেয়া করদাতাদের বৃহৎ করদাতা ইউনিটে নিমন্ত্রণ

বকেয়া করদাতাদের তালিকা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)।

বকেয়া করদাতাদের তালিকা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)। যাদের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি ও ব্যক্তি খাতের বড় করদাতারা। নতুন কমিশনার যোগ দেয়ার পর তালিকা তৈরির কাজ শুরু হলেও বকেয়া আদায়ে সংশ্লিষ্টদের আরো আগে থেকেই তাগাদা দিচ্ছে এলটিইউ। এ অবস্থায় আজ থেকে এসব করদাতাকে চায়ের নিমন্ত্রণ জানিয়েছে সংস্থাটি।

এলটিইউ সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে ৩৫০ বকেয়া করদাতার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এজন্য ১৬টি টিম কাজ করছে। তবে এগুলো এখনো যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে। করদাতাদের আপত্তি জানানোর জন্য সময়ও দেয়া হচ্ছে। চূড়ান্ত তালিকার জন্য আরো সময় লাগবে।

এলটিইউর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা কর ফাঁকি বা বকেয়া কর না বলে বিতর্কিত বা অবিতর্কিত বকেয়া কর বলি। এ রকম ১৭-১৮ হাজার কোটি টাকার বিতর্কিত বকেয়া কর রয়েছে। এছাড়া অবিতর্কিত ৮০০ কোটি টাকার বকেয়া কর ছিল। গত জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আহরণ হয়েছে। হাইকোর্ট থেকে কিছু মামলা এডিআরে (বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) চলে আসায় এটা সম্ভব হয়েছে।’

বিতর্কিত বকেয়া করের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনভাবে বিতর্কিত বকেয়া কর হিসাব করা হয়। এর মধ্যে আপিলে প্রায় ৪৫০ করদাতার কাছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা, ট্রাইব্যুনালে প্রায় ৪৫০ করদাতার কাছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ও হাইকোর্টে প্রায় ৭৫০ করদাতার কাছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বিতর্কিত বকেয়া কর রয়েছে।’

বকেয়া করদাতাদের তালিকার বিষয়ে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ কর) কমিশনার খাইরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রথমত আমরা সম্মানিত করদাতাদের চায়ের দাওয়াত দেব। চায়ের টেবিলে তাদের সঙ্গে আলোচনা করব। বকেয়া পরিশোধের জন্য আহ্বান জানাব, অনুরোধ করব। তারা একসঙ্গে বা ধাপে ধাপে বকেয়া পরিশোধ করতে পারবেন। যারা স্বেচ্ছায় পরিশোধ করবেন না দ্বিতীয় পর্যায়ে তাদের চিঠি দেয়া হবে। তার পরও যারা বকেয়া পরিশোধ করবেন না তৃতীয় পর্যায়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে। তাদের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করব। বকেয়া আদায়ের জন্য যা যা করা দরকার, আমরা করব। প্রয়োজনে সার্টিফিকেট মামলা করা হবে।’

এলটিইউর একজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, বকেয়ার বিষয়ে জানিয়ে দেয়ার পর করদাতারা আপত্তি জানাতে সাতদিন সময় পেয়ে থাকেন। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। তার পরও যারা বকেয়া পরিশোধ করবেন না, তাদের ক্ষেত্রে সরকারি পরিষেবা (গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি) সরবরাহ বন্ধ রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে চিঠি দেয়া হয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে সার্টিফিকেট মামলাও করা হয়। তবে মামলার দিকে যেতে আগ্রহী নয় এনবিআর।

এলটিইউ প্রকাশিত হ্যান্ডবুক ২০২৩-এর তথ্যানুযায়ী, এ ইউনিটের করদাতার সংখ্যা ১ হাজার ৩১৩। এর মধ্যে ব্যাংক খাতে ৬৫, সাধারণ বীমা কোম্পানি ৪৮, জীবন বীমা কোম্পানি ৩৫, মার্চেন্ট ব্যাংক ৮১, লিজিং ও ইনভেস্টমেন্ট ৩৯, টেলিকমিউনিকেশন ৬, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানি ৭, গার্মেন্টস কোম্পানি ১৪, টেক্সটাইল ২২, মাল্টিপল প্রডাক্টস ৯, ফার্মাসিউটিক্যালস ১৪, ম্যানুফ্যাকচারিং ৭৪, অন্যান্য ৪৭ ধরনের করদাতাসহ মোট কোম্পানি করদাতার সংখ্যা ৪৫৩। এছাড়া ব্যক্তি করদাতা ৮৬০ জনসহ মোট করদাতার সংখ্যা ১ হাজার ৩১৩।

এলটিইউ কর ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ করবর্ষে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৩৩ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২২-২০২৩ করবর্ষে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ২৯ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ২৫ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। অর্থাৎ ১২ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

এলটিইউ ভ্যাট ইউনিটের কমিশনার মো. সামছুল ইসলাম বণিক বার্তাকে জানান, তার ইউনিটে শুধু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে ১৭ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এলটিইউ ভ্যাট দেশের বিভিন্ন জেলার ১০৯টি বৃহৎ করদাতা প্রতিষ্ঠানে রাজস্ব (মূল্য সংযোজন কর, সম্পূরক শুল্ক ও আবগারি শুল্ক) সংক্রান্ত সেবা দিয়ে থাকে। আধুনিক মূসক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে জাতীয় বাজেটে সম্পদের সরবরাহের লক্ষ্যে প্রায় ১৩৫ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মাধ্যমে দাপ্তরিক কার্যাদি সম্পাদন করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের পরোক্ষ কর খাত থেকে ৬৯ হাজার ৬৭৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। যার বিপরীতে ৭৩ হাজার ৬৬০ কোটি ১ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। অর্থাৎ বিগত বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

আরও