আসন্ন শীত মৌসুমে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ নিশ্চিত করতে মরিয়া ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো। ফলে বিশ্ববাজারে শুরু হতে পারে তীব্র প্রতিযোগিতা। বাজার বিশ্লেষক ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানি খাতে বৈশ্বিক এ সংকটের কারণে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম নতুন করে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
বর্তমানে ইউরোপের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছে। কারণ অঞ্চলটির নিজস্ব গ্যাসের মজুদ ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে শীতের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি এলএনজি আমদানি করতে হবে। অন্যদিকে লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সংকট এড়াতে আগের চেয়ে অনেক বেশি দামে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে এশিয়ার আমদানিকারক দেশগুলো। এতে ইউরোপীয় আমদানিকারকদের জন্য বাজার বেশ কঠিন হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েক মাস ধরেই এলএনজির দাম দ্রুত বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে কৌশলগত সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে এশিয়ার বেঞ্চমার্ক প্লাটস জাপান কোরিয়া মার্কারের (জেকেএম) দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) প্রায় ৩০ ডলারে পৌঁছায়। বর্তমানে ইউরোপে এ দাম সাড়ে ২৪ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে। বিশ্ববাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, শীতের প্রকোপ বাড়লে তা আরো বেড়ে যেতে পারে।
জ্বালানি বাজারের এ সংকটকে আরো জটিল করে তুলেছে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর নতুন কৌশল। অতীতে দাম বাড়লে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো মূল্য সংবেদনশীল দেশগুলো এলএনজি কেনা থেকে বিরত থাকলেও এবার চিত্র ভিন্ন। অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট সামলাতে এসব দেশ ২৫ ডলারের মতো চড়া দামেও এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। শিল্প খাতে গ্যাসের প্রয়োজনীয়তা ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সীমাবদ্ধতার কারণে এখন আর দেশগুলোর নতুন করে ব্যবহার কমানোর সুযোগ নেই।
জাপানের ইনপেক্স করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী তাকায়ুকি উয়েদা বলেন, ‘এশিয়ার যেসব ক্রেতা দেশ সাধারণত দামের বিষয়ে বেশি সংবেদনশীল, তারাও এখন বেশি দামে এলএনজি কিনতে প্রস্তুত। এতে বৈশ্বিক গ্যাসের বাজারে বড় পরিবর্তন এসেছে। ভারত ও পাকিস্তানও এখন দামের ওঠানামার সঙ্গে অভ্যস্ত।’
মরগান স্ট্যানলির জ্বালানি বিশ্লেষক মার্টিন র্যাটসের মতে, চড়া দামেও এশিয়ার বাজারে সক্রিয় ক্রেতা উপস্থিত থাকার অর্থ হলো ইউরোপীয় দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় গ্যাস পেতে আরো বেশি অর্থ ঢালতে হবে। গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এ শীতে এলএনজির দাম এমএমবিটিইউপ্রতি ৩৫ ডলার স্পর্শ করতে পারে।
স্পট মার্কেট বা খোলা বাজারে অস্বাভাবিক দরপতনের ঝুঁকি এড়াতে এশিয়ার প্রধান আমদানিকারক দেশগুলো এখন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির দিকে নজর দিচ্ছে। ২০ বছর মেয়াদি সরবরাহের নিশ্চয়তা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে তারা দর কষাকষি করছে। তবে পরিবেশ সুরক্ষায় মিথেন নিঃসরণ সম্পর্কিত কঠোর ইইউ বিধিমালার কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যেতে দ্বিধায় ভুগছে।
সব মিলিয়ে আসন্ন শীতে আবহাওয়া কেমন থাকবে, তার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে বৈশ্বিক এলএনজি খাতের ভবিষ্যৎ।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, শীতের তীব্রতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি আবার সৃষ্টি হতে পারে।