একই সঙ্গে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবারের (পিএসএফ) ওপর প্রস্তাবিত ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং রফতানি নগদ সহায়তার ওপর উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। রাজধানীর গুলশান ক্লাবে গতকাল বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানান, দেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন, রফতানি আয় ও কর্মসংস্থানের অন্যতম ভিত্তি টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাত। বর্তমানে বিটিএমএর সদস্যভুক্ত প্রায় ১ হাজার ৮৭৮টি স্পিনিং, উইভিং, ডায়িং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিং মিল রয়েছে। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার। দেশের রফতানি আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি আসে টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল খাত থেকে। পাশাপাশি দেশীয় টেক্সটাইল শিল্প প্রতি বছর প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে।
তিনি বলেন, ‘বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, রফতানি প্রণোদনা কমে যাওয়া, কাঁচামালের মূল্য অস্থিরতা এবং চলতি মূলধনের সংকটে শিল্পটি দীর্ঘদিন ধরে চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিদেশী সুতা আমদানি, যা দেশীয় উৎপাদকদের অসম প্রতিযোগিতার মুখে ফেলছে।’
বিটিএমএ সভাপতি বলেন, ‘ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত প্রত্যাহার করা হলে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, অনিয়ম এবং বাজারে অসম প্রতিযোগিতা বাড়বে। এলডিসি উত্তরণের পর রফতানি বাজারে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন, রুলস অব অরিজিন এবং ডাবল স্টেজ ট্রান্সফরমেশনের মতো শর্ত পূরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই দেশীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পকে দুর্বল করে এমন কোনো নীতিগত পরিবর্তন ভবিষ্যৎ রফতানি সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতে কার্যকর করহার ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ হলেও রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতে করহার ১২ শতাংশ। একই ভ্যালু চেইনের অংশ হয়েও টেক্সটাইল খাত বেশি করের বোঝা বহন করছে।’ এ কারণে করপোরেট করহার ১২ শতাংশ নির্ধারণ করে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার দাবি জানান বিটিএমএ সভাপতি।
শওকত আজিজ রাসেল আরো বলেন, ‘বৈশ্বিক পোশাক বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ এখন ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক। কিন্তু বাংলাদেশের রফতানি এখনো প্রধানত তুলাভিত্তিক। এ অবস্থায় পিএসএফের ওপর ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ দেশীয় সুতা উৎপাদনের ব্যয় বাড়াবে এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমাবে।’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে ২৩৪টি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে, যার মধ্যে ১১৪টি স্পিনিং মিল। অনেক কারখানা বর্তমানে ৬০-৭০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। একই সময়ে দেশে সুতা আমদানির পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি ছিল ১৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছে। ভারত থেকে সুতা আমদানিও এ সময়ে প্রায় ১০৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিটিএমএর তথ্যমতে, প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতে সরাসরি প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। পরোক্ষভাবে প্রায় এক কোটি মানুষ এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে শিল্পটির সংকট শুধু উদ্যোক্তাদের নয়; বরং কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাত এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমএর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ আল মামুন দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পকে আরো স্বনির্ভর করে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি এ শিল্পের টেকসই বিকাশে সরকারের নীতিগত সহায়তা জোরদারের আহ্বান জানান।
এ সময় বিজিএপিএমইএর সভাপতি মো. শাহরিয়ার অ্যাকসেসরিজ শিল্পের জন্য সহায়ক নীতি প্রণয়নের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার অভাবে এ খাত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পিছিয়ে রয়েছে।’
দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পকে রক্ষা করা মানে দেশের রফতানি, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ শিল্পায়নকে সুরক্ষা দেয়া উল্লেখ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় বিটিএমএ।