এর প্রভাবে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে অঞ্চলটির কৃষি খাত । তীব্র গরম ও অনাবৃষ্টির কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে প্রধান ফসল উৎপাদন। পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ফসল বোনার কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এ অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহ ও মূল্যবৃদ্ধির নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভারত থেকে শুরু করে থাইল্যান্ড কিংবা ইন্দোনেশিয়া সব খানেই কৃষকরা এখন বড় সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। খবর রয়টার্স।
চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে সার ও ডিজেলের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকটে কৃষকরা যখন এমনিতেই বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই এল নিনোর প্রভাবে খরা পরিস্থিতি তাদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার ও জ্বালানি ঘাটতির কারণে চলতি বছর চাষাবাদ অনেক বেশি কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।
আবহাওয়াবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি হতে পারে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবিতে এরই মধ্যে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে খরার প্রাথমিক লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ভারতে আবহাওয়া অধিদপ্তর তাদের চার মাস মেয়াদি মৌসুমি বায়ুর পূর্বাভাসের হার অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। সাধারণত এ মৌসুমি বায়ু থেকেই দেশের বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে। বর্তমানে ভারতের বেশির ভাগ অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে ধান, সয়াবিন, ডাল, আখ ও ভুট্টা সময়মতো বোনার জন্য পরিস্থিতি একদমই অনুকূলে নেই। কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে বীজ বপনের সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয়ও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে সাধারণত জুন-জুলাইয়ে প্রধান ধান চাষ করা হয়। তবে তীব্র পানির অভাবে এবার কৃষকেরা ধান রোপণ করতে সাহস পাচ্ছেন না। অনেক চাষী জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এমন থাকলে তারা দ্বিতীয়বার বীজ বপন থেকে বিরত থাকবেন। ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল জাভা দ্বীপে টানা ১০ দিনের বেশি বৃষ্টি হয়নি। দেশটির আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী সপ্তাহগুলোয়ও খুব কম বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে।
বাজারে এ মুহূর্তে চালের কোনো বড় ঘাটতি না থাকলেও সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় এরই মধ্যে দাম বাড়তে শুরু করেছে। গত এক মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান রফতানি কেন্দ্রগুলোয় চালের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে প্রধান উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোয় খরার উদ্বেগের কারণে ২০২৬ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত গমের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।
বিশ্বের মোট চাল রফতানির প্রায় ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে ভারত। আগের বছরগুলোয় রেকর্ড ফলনের কারণে তাদের প্রচুর চালের মজুদ রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিস্থিতি সময়মতো ঠিক না হলে ভারত সরকার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাল রফতানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। এমনটি হলে চাল আমদানিকারক দেশগুলোয় বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।
থাইল্যান্ডের একটি গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, দেশটির জলাশয়গুলোয় পর্যাপ্ত পানি থাকায় খরার প্রভাব কিছুটা সামাল দেয়া সম্ভব। তবে সার ঘাটতি সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারের অভাবে চাল উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায়ও আগামী তিন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় গমের ফলন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। তবে এল নিনো পরিস্থিতি চীন ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে তেমন প্রভাব ফেলবে না। বরং আমেরিকার কৃষি অঞ্চলে বৃষ্টিপাত আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।