একসময় ফিলিপাইনের ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় খাবারের উপকরণ ছিল বেগুনি রঙের কন্দজাতীয় ফসল ‘উবে’ বা মিষ্টিআলু। এখন সে উবেই জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্যাফে, বেকারি ও রেস্তোরাঁয়। টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর উজ্জ্বল বেগুনি রঙ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর কফি, কেক, পেস্ট্রি ও আইসক্রিমে উবের ব্যবহারও বাড়তে থাকে। আন্তর্জাতিক কফি চেইন স্টারবাকস ও কোস্টা কফিও এ বছর উবে স্বাদের পানীয় বাজারে এনেছে। ক্যাফে সংস্কৃতিতে এটিকে অনেকে এখন বিখ্যাত ‘মাচা’র বিকল্প হিসেবেও দেখছেন। তবে চাহিদা যখন দ্রুত বাড়ছে, তখনই উবের সরবরাহ নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদক দেশ ফিলিপাইন। দেশটি তাজা উবে রফতানির ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত ও নিজস্ব কৃষি সম্পদ রক্ষা করতেই দেশটির সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
উবে গাছ চাষের ধরন অন্যান্য ফসলের চেয়ে আলাদা। এটি বীজ দিয়ে হয় না, বরং কন্দের বা আলুর টুকরো থেকেই নতুন গাছ তৈরি করা হয়। গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে চাহিদা বাড়ায় ফিলিপাইনের অনেক কৃষক চাহিদা মেটাতে মজুদের বড় অংশ বিক্রি করে দেন। এতে পরবর্তী মৌসুমে চাষ বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় মানসম্মত বীজ বা কাঁচামালের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
ফিলিপাইনের পরিসংখ্যান কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, এ বছরের প্রথমার্ধে দেশটির উবে উৎপাদন ১৭ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৬৬০ টনে পৌঁছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। বিগত এক দশকে দেশটির সামগ্রিক উবে উৎপাদন কমে যায়। যেমন ২০২৪ সালে যেখানে দেশটিতে ১৩ হাজার ৪০০ টন উবে উৎপাদন হয়, গত বছর তা ১২ হাজার ৫০০ টনের নিচে নেমে আসে।
ফিলিপাইনের কৃষিমন্ত্রী ফ্রান্সিসকো পি তিউ লরেল জুনিয়র বলেন, ‘আমাদের নিজেদেরই চাষের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের প্রচণ্ড অভাব দেখা দিয়েছে। আমরা এমন কোনো দেশে সতেজ আলু পাঠাতে চাই না, যারা আমাদের দেশীয় জাত ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আমাদের সঙ্গেই বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়বে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিপাইনের রফতানি নিষেধাজ্ঞার পেছনে প্রধানত দুটি উদ্দেশ্য কাজ করছে। প্রথমত, নিজেদের দেশে উবের রোপণ বাড়াতে পর্যাপ্ত বীজ আলু জমা রাখা। দ্বিতীয়ত, চীন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো যাতে স্থানীয় জাত ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
রফতানি বন্ধ হলেও ফিলিপাইনের বাজারে উবের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে দেশটির স্থানীয় কৃষকেরা প্রতি কেজি উবের দাম পাচ্ছেন ১০০-১৫০ পেসো (১ ডলার ৫৯ সেন্ট থেকে ২ ডলার ৩৮ সেন্ট)। ফলে সরকারের এখন প্রধান লক্ষ্য কাঁচা আলু রফতানি না করে প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজার বাড়ানো।
অবশ্য ফিলিপাইনের দেয়া এ নিষেধাজ্ঞা শুধু তাজা বা কাঁচা উবের ওপর প্রযোজ্য হবে। প্রক্রিয়াজাত বা হিমায়িত উবের ওপর কোনো বাধা থাকছে না, যা আমেরিকা ও ইউরোপের রেস্তোরাঁগুলোয় মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস