পিডব্লিউসির জরিপ

দেশে আগামী ৩ বছরে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মী কমাবে এআই

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবে বাংলাদেশে আগামী তিন বছরে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মী সংখ্যা কমে আসবে বলে মনে করেন দেশের বিভিন্ন কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীরা।

তবে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা না থাকলেও উভয় স্তরেই কিছুটা পরিবর্তন আসবে। বিপরীতে শীর্ষস্থানীয় পদগুলোয় কর্মী কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ; বরং এআই তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে আরো শক্তিশালী করবে।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্স বা পিডব্লিউসি পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বের ৯৫টি দেশ ও অঞ্চলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মোট ৪ হাজার ৪৫৪ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) ওপর এ জরিপ পরিচালনা করা হয়। গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এ জরিপে বাংলাদেশ থেকে ৪৫ জন সিইও অংশগ্রহণ করেন।

‘শেপিং টুমরোস এন্টারপ্রাইজেস: ভ্যালু ক্রিয়েশন ইন দ্য এইজ অব এআই’ শীর্ষক এ জরিপে আগামী তিন বছরে এআইয়ের কারণে নিম্ন স্তরে কর্মী সংখ্যা হ্রাস পেতে পারে বলে মত দিয়েছেন বাংলাদেশের ৩৫ শতাংশের বেশি সিইও। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষেত্রে এ হার ৪৩ শতাংশ এবং বৈশ্বিকভাবে ৪৯ শতাংশ সিইও এ সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশে মধ্যম স্তরেও কর্মী সংখ্যা কিছুটা কমবে বলে মত দিয়েছেন প্রায় ৩০ শতাংশ সিইও। বিপরীতে তারা জ্যেষ্ঠ বা নেতৃত্বস্থানীয় পদগুলোয় আগামী তিন বছরে কর্মী কমার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না।

ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এআইয়ের সংযোজনে বাংলাদেশ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে বলে উঠে এসেছে জরিপে। দেশের ২০ শতাংশ সিইও জানিয়েছেন, তারা তাদের চাহিদা তৈরি এবং কৌশলগত দিকনির্দেশনা নির্ধারণের মতো মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় পরিসরে এআই ব্যবহার করছেন। বিপরীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১২ শতাংশ ও বৈশ্বিকভাবে ১৫ শতাংশ সিইও কৌশলগত দিকনির্দেশনা নির্ধারণে এআইয়ের সহায়তা নেন। সামগ্রিকভাবে দেশের ১৬ শতাংশ সিইও সহায়তা সেবা ও পণ্য উন্নয়ন এবং ১৩ শতাংশ সিইও চাহিদা পূরণে এআই ব্যবহার করছেন।

জরিপ পরিচালনা-পূর্ববর্তী ১২ মাসে এআই ব্যবহারের ফলে কোম্পানির আয় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন ২০ দশমিক ৫ শতাংশ সিইও। আর ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ সিইওর মতে, এআই কোম্পানির পরিচালন ব্যয় কমাতে সাহায্য করেছে।

সিইওরা বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এআই গ্রহণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক বা সহায়ক বলে মনে করলেও কাঠামোগত দুর্বলতা বড় পরিসরে এর বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে জানিয়েছেন তারা। দেশের ৬৪ দশমিক ১ শতাংশ সিইও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এআই গ্রহণের অনুকূলে এবং ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ সিইও নিজেদের কোম্পানির প্রযুক্তিগত পরিবেশ এআই একীভূতকরণের উপযোগী বলে মত দিয়েছেন। যদিও তথ্যের সহজলভ্যতা ও সঠিক রোডম্যাপের অভাব এখনো বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। সুশাসন, বিনিয়োগ এবং মেধার ঘাটতি এ অগ্রগতিকে আরো সীমিত করছে। এছাড়া উচ্চমানের কারিগরি এআই প্রতিভা বা মেধা আকর্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার বৈশ্বিক সমকক্ষ দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।

দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সিইও আগামী ১২ মাসে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে মাঝারি থেকে উল্লেখযোগ্য উন্নতির প্রত্যাশা করছেন। যদিও বৈচিত্র্যকরণের আগ্রহ এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য উল্লেখযোগ্য আয়ের ক্ষেত্র হিসেবে রূপান্তরিত হতে পারেনি। দেশের অনেক সিইও তাদের ব্যবসা নতুন নতুন খাতে প্রবেশ করার কথা জানালেও মাত্র ১৫ শতাংশ জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে তাদের আয়ের ২০ শতাংশের বেশি এসেছে এ নতুন খাতগুলো থেকে। বিপরীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষেত্রে এ হার ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ মূল শিল্পের বাইরে গিয়ে নতুন খাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাড়লেও ভিন্নধর্মী খাত থেকে অর্থপূর্ণ আয়ের উৎস তৈরি করা এখনো অনেক বাংলাদেশী কোম্পানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

আগামী এক বছরে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং মূল্যস্ফীতি ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় বলেও জানিয়েছেন এ শীর্ষ নির্বাহীরা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১৯ শতাংশ ও বৈশ্বিকভাবে ২৫ শতাংশ সিইও মূল্যস্ফীতিকে ব্যবসার অন্যতম প্রধান হুমকি হিসেবে দেখলেও বাংলাদেশের প্রায় ৩৮ শতাংশ সিইওই এ বিষয়টিকে ব্যবসা প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন।

এছাড়া ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং শুল্ক বৃদ্ধির কারণে বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সিইওরা সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। প্রায় ৪৪ শতাংশ সিইও আগামী তিন বছরে তাদের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের পরিকল্পনা করছেন। আর ৩০ শতাংশ সিইও দেশের কম বিশ্বস্ত প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের ওপর তাদের নির্ভরতা কমিয়ে আনার কথা ভাবছেন।

বাংলাদেশের সিইওরা তাদের কর্মঘণ্টার সিংহভাগই ব্যয় করেন স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে। গড়ে তারা তাদের কর্মঘণ্টার ৫১ দশমিক ২ শতাংশ সময় ব্যয় করেন এক বছরের কম সময়ের কৌশল নির্ধারণে। এক-পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ৩৪ শতাংশ এবং পাঁচ বছরের বেশি সময়ের দূরদর্শী পরিকল্পনায় মাত্র ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ সময় দেন তারা।

সার্বিক বিষয়ে পিডব্লিউসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান বলেন, ‘‌এআই গ্রহণ এবং এটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রবণতা ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা গেলেও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রস্তুতির অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এমন কিছু কার্যপদ্ধতি গ্রহণ করেছে, যা গ্রাহকদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ, আশানুরূপ ফলাফল না দেয়া প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা, বহিরাগত অংশীদারদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি এবং উদ্ভাবনের জন্য সুনির্দিষ্ট কাঠামো গঠনের মতো বড় পরিসরের উদ্ভাবনকে একটি নিয়মিত চক্রে পরিণত করতে পারে।’ এ নিম্নমুখী হারের কারণে এআই প্রকল্পগুলোকে বাস্তব ফলাফলমুখী সাফল্যে রূপান্তর করার শতকরা হার কমে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আরও