মৎস্য চাষের পারিবারিক ব্যবসা রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী অর্পিতা দাসের। এ ব্যবসার কিছু আনুষঙ্গিক কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির জন্য গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষুদ্রঋণ সরবরাহকারী দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দেড় লাখের বেশি রুপি ঋণ করেছিলেন তিনি। সে সময়ে তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি সামনের দিনগুলোয় কী দুঃসময় অপেক্ষা করছে তার জন্য। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে যে তার জীবিকা অর্জনের পথ থমকে যাবে, তা চিন্তা করেননি অর্পিতা। কিন্তু বাস্তবে সেটাই হলো। ঋণ নেয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চিংড়ির চাহিদায় ব্যাপক ধস নামে। ফলে তার ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। আয় না থাকায় প্রতি মাসে ঋণের কিস্তি হিসেবে প্রায় ১৩ হাজার রুপি পরিশোধের সক্ষমতাও হারান তিনি।
তিন বছর আগে ব্যবসার কাজে ক্ষুদ্রঋণ নেয়া শুরু করেন অর্পিতা। তখন থেকে কভিড-১৯ মহামারীর প্রাদুর্ভাবের আগ পর্যন্ত একটি কিস্তিও পরিশোধে ব্যর্থ হননি তিনি। কিন্তু জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ানো মহামারী সবকিছুই ওলটপালট করে দিল। এখন অর্পিতা ও তার পরিবারের কারো আয়ের সংস্থান নেই। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে নতুন করে লাখখানেক রুপি ঋণ করতে না পারলে এ বছর আর চিংড়ি চাষ করতে পারবেন না তিনি।
কিন্তু আগের ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে নতুন করে আর একটি পয়সাও ধার দেবে না ক্ষুদ্র ঋণদাতারা। তাহলে অর্পিতা কেমন করে পুনরায় ব্যবসা শুরু করবেন? তার আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত হয়তো তাকে দাদন ব্যবসায়ীদেরই দ্বারস্থ হতে হবে। আর সেক্ষেত্রে সুদের হারটাও হবে অনেক চড়া।
কভিড-১৯ মহামারীতে পুরো বিশ্বের আর্থিক খাতই বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। অনেক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানই পড়েছে মন্দার কবলে। তবে ভারতের ক্ষুদ্রঋণ খাতে যে আঘাতটা এসেছে, তা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেকটাই বেশি। কারণ ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে ভারত বিশ্বে শীর্ষস্থানে রয়েছে। সেখানকার দরিদ্র ব্যবসায়ীরা যখন প্রথাগত ব্যাংকঋণ পাওয়ার জন্য অযোগ্য বিবেচিত হন, তখন তাদের সামনে ক্ষুদ্র ঋণদাতাদের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা থাকে না।
উদ্যোক্তাপ্রতি ক্ষুদ্রঋণের পরিমাণ হয়তো খুব বেশি নয় (গড়ে প্রায় ৩৫ হাজার ৫০০ রুপি), কিন্তু
সম্মিলিতভাবে অংকটা অনেক বড়। কারণ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশটিতে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণকারীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। গত পাঁচ বছরে এ সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। মাইক্রোফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশনস নেটওয়ার্কের (এমএফআইএন) তথ্য বলছে, বর্তমানে ভারতে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। প্রতি ২০ জন ভারতীয়র মধ্যে একজনের ঘাড়ে ক্ষুদ্রঋণের বোঝা রয়েছে। সব মিলিয়ে এ ঋণের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ৬০০ কোটি রুপি।
যে ক্ষুদ্রঋণকে একসময় দারিদ্র্যমুক্তির কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, তা আজ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষুদ্র পরিসরে শুরু হওয়া এ ঋণ কার্যক্রম একসময় বৈশ্বিক এন্টারপ্রাইজে পরিণত হলেও এ কাঠামো আজ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪ কোটি ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতা রয়েছেন, যার ৮০ শতাংশ গ্রাহকই নারী। মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যারোমিটারের ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের ক্ষুদ্রঋণ অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে।
ভারতে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণকারীরা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারানোয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বিপাকে রয়েছে। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৯৬টি ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন ব্যাংক ও বেসরকারি সংস্থাও (এনজিও) ক্ষুদ্রঋণ দেয়। মহামারীর কারণে ভারতের অর্থনীতি ১৯৫২ সালের পর সবচেয়ে বাজে সংকোচনের পথে রয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণকারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় ধস নামায় তারা এমন ঋণচক্রের জালে আটকা পড়েছেন, যা থেকে কবে মুক্তি মিলবে তা বলা যাচ্ছে না। আর অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধন ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, মহামারীর কারণে সৃষ্ট সংকট ভারতের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের ভবিষ্যেকই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ব্লুমবার্গ