বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর

আমানতকারীরা সহায়তা করলে ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে পারবে

খেলাপি ঋণকে গভর্নর ব্যাংকিং খাতের বড় সমস্যা উল্লেখ করে বলেন, ঋণের ৮৭ শতাংশই একটি পরিবারের কাছে গেছে এমন ঘটনাও রয়েছে। এটি কাঠামোগত ঝুঁকি এবং দুর্বল শাসন ব্যবস্থার প্রতিফলন। এ সমস্যা সমাধানের জন্য একটি ব্যাংক রেগুলেশন আইনের খসড়া করা হয়েছে, যার মধ্যে একীভূতকরণ, তহবিল সরবরাহ‌সহ অন্যান্য পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, ছয়টি ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেয়া হয়েছে যাতে করে আমানতকারীরা তাদের টাকা পান। আমানতকারীরা সহায়তা করলে ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। আমি আমানতকারীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানাই।

বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টরস কনফারেন্স ২০২৪’-এর ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর রিফর্ম’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন। ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ এ কনফারেন্সের আয়োজন করে।

গভর্নর বলেন, বর্তমানে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত ব‌হিঃখাতকে স্থিতিশীল করা, দ্বিতীয়ত আমদানি কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাত। গত চার মাসে অনিষ্পন্ন ঋণপত্রের পরিমাণ ২৫০ কো‌টি ডলার থেকে কমিয়ে ৩০ কো‌টি ডলারে না‌মিয়ে আনা হয়েছে। কোন ব্যাংকের মাধ্যমে এবং কোন কোম্পানি এসব ঋণপত্র খোলার সঙ্গে জড়িত ছিল তা চিহ্নিত করার জন্য প্রচেষ্টা চলছে। আগামী মাসগুলোতে অ‌নিষ্পন্ন ঋণপত্রের পরিমাণ শূন্যে নামিয়ে আনতে চাই।

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর আগের মতো ডলার বিক্রি করছে না। কোনো ব্যাংককে ডলার দিয়ে সহায়তা করা হচ্ছে না। প্রবাসীদের অবদানের কারণে গত পাঁচ মাসে অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জিত হয়েছে। চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও রফতানি প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ হয়েছে এবং আর্থিক হিসাবও ইতিবাচক হয়েছে। লেনদেন ভারসাম্য ও ব‌হিঃখাতের সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

গভর্নর আশা করেন না যে নিকট ভবিষ্যতে ব‌হিঃখাতে বড় আঘাত আসার সম্ভাবনা নেই। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে ডলারের তুলনায় টাকা রাখা বেশি লাভজনক। এর ফলে ব্যাংকগুলোর নস্ট্রো অ্যাকাউন্টে ডলারের ব্যালেন্স কমেছে।

মুল্যস্ফীতি এখনো উদ্বেগের বিষয় উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, বিশেষ করে বন্যা ও দীর্ঘায়িত বর্ষাকালের মতো সরবরাহ-সম্পর্কিত সমস্যার কারণে মূল্যস্ফী‌তি এখনো বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারকে এখন আর কোনো তহবিল সরবরাহ করছে না। এর পরিবর্তে সরকার মুদ্রা বাজার থেকে ঋণ নিচ্ছে। মুল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সংকোচনমূলক মুদানী‌তি প্রয়োগ করেছে। এর ফলাফলের জন্য কিছু‌দিন অপেক্ষা করতে হবে। সাধারণত এক বছর লাগবে এ ধরনের নীতির সুফল পেতে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসের মূল্যস্ফী‌তির প‌রিসংখ্যান পাওয়ার পর মুদ্রানীতির প্রভাব মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। সামনের বছরের জুনের শেষ নাগাদ মূল্যস্ফীতিকে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

খেলাপি ঋণকে গভর্নর ব্যাংকিং খাতের বড় সমস্যা উল্লেখ করে বলেন, ঋণের ৮৭ শতাংশই একটি পরিবারের কাছে গেছে এমন ঘটনাও রয়েছে। এটি কাঠামোগত ঝুঁকি এবং দুর্বল শাসন ব্যবস্থার প্রতিফলন। এ সমস্যা সমাধানের জন্য একটি ব্যাংক রেগুলেশন আইনের খসড়া করা হয়েছে, যার মধ্যে একীভূতকরণ, তহবিল সরবরাহ‌সহ অন্যান্য পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলেন, জানুয়ারি মাসে ব্যাংকের সম্পদের গুণমান পর্যালোচনার কাজ শুরু হবে। এর ফলে কারা ঋণ নিয়েছে, কতটা নিয়েছে এবং খাতটির সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে জানা সম্ভব হবে। এছাড়াও দেউলিয়া আইন প্রবর্তনের জন্য আলোচনা চলছে, যা দেউলিয়া সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে। এর মধ্যে ঝুঁকি কমাতে ব্যাংকগুলোকে তাদের ঋণ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে।

সামনে খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশে দাঁড়াতে পারে উল্লেখ করে গভর্নর ব‌লেন, আগামী ৩-৪ মাসে খেলাপি ঋণ নিয়ে ভালো খবর পাওয়ার সম্ভাবনা কম। খেলাপি ঋণ কমাতে এবং ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতে শাসন ব্যবস্থার উন্নতি এবং নিয়ম-কানুন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক সমস্যা এরই মধ্যে সমাধান করা হয়েছে, তবে সামনে আরো কাজ রয়েছে এবং এটি ধাপে ধাপে করা হবে।

আরও