ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাড়ছে সরকারি বন্ডের সুদহার। এতে ১৫ বছর আগের ঋণ সংকটের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ইউরোজোনে। বন্ডের দাম কমে যাওয়া এবং ঋণ নেয়ার খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাপে পড়তে পারে ব্যাংকগুলো। তবে আগের সংকটের তুলনায় ব্যাংকগুলোর মূলধন পরিস্থিতি ভালো। পাশাপাশি তদারকি জোরদার হওয়ায় এবার প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারের অস্থিরতা সামাল দিতে বেশি সক্ষম বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীরা। খবর রয়টার্স।
ইউরোপের সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকগুলোর শেয়ারের দামেও এর প্রভাব পড়েছে। গত ছয় সপ্তাহে ইউরোপের ব্যাংক খাতের শেয়ারের দাম কমেছে ১০ শতাংশ। এ সময় সামগ্রিক বাজারে দরপতন হয়েছে এর এক-পঞ্চমাংশ। এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে দর বাড়ায় ব্যাংক খাতের শেয়ার ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছিল। একই সময় ফ্রান্সের শীর্ষ তিন ব্যাংকের শেয়ারের দাম কমেছে ১৭ শতাংশ।
ফ্রান্সকে ঘিরে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। ইউরোজোনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিটির সরকারি ঋণের সুদহার ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। বড় বাজেট ঘাটতি, সামাজিক অস্থিরতা এবং আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা এ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। জনমত জরিপে কট্টর ডানপন্থী ও কট্টর বামপন্থী প্রার্থীরা এগিয়ে থাকায় দেশটির অর্থনৈতিক নীতি নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ।
এ পরিস্থিতিতে ইউরোপে আবারো আলোচনায় এসেছে ২০১০ সালে তৈরি হওয়া ডুম লুপ বা ঋণসংকটের দুষ্টচক্র। এ চক্রে সরকারি ঋণের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে বন্ডে বিনিয়োগ করা ব্যাংকগুলো লোকসানে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব ব্যাংককে বাঁচাতে সরকারকে অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে সরকারি ব্যয় ও ঋণের বোঝা আরো বাড়ে। ফলে সরকারের আর্থিক অবস্থার অবনতি হয় এবং ব্যাংকগুলোর ওপর চাপও বাড়তে থাকে।
মুডিস রেটিংসের জ্যেষ্ঠ ব্যাংক বিশ্লেষক সাইমন আইনসওর্থ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘দেশের আর্থিক পরিস্থিতি থেকে ব্যাংকগুলোকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব নয়। ব্যাংকগুলো এখন তুলনামূলক ভালো অবস্থান থেকে সংকট মোকাবেলা করছে। তবে দেশের আর্থিক দুরবস্থার ঝুঁকি থেকে এ খাত মুক্ত নয়।’
সরকারি বন্ডে ব্যাংকের বিনিয়োগ বেড়েছে
ইউরোপের ব্যাংকগুলোর জন্য সরকারি বন্ড গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। নিয়ম অনুযায়ী, এসব বন্ডকে ঝুঁকিমুক্ত সম্পদ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নেয়ার সময় জামানত হিসেবেও এগুলো ব্যবহার করা যায়।
সরকারি বন্ডে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বাড়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে ইউরোপীয় ব্যাংকিং কর্তৃপক্ষের (ইবিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-এর দশকের ঋণ সংকটের পর ইউরোজোনের ব্যাংকগুলোর সরকারি বন্ডে নিট বিনিয়োগ দ্বিগুণ হয়েছে। গত জুনের শেষে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি ইউরোয়।
একই সময় ব্যাংকগুলোর মূলধনও বেড়েছে। ফলে সম্ভাব্য লোকসান সামাল দেয়ার জন্য রাখা মূলধনের তুলনায় সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের অনুপাত কমেছে। ২০১৩ সালে এ অনুপাত ছিল ২ দশমিক ৭। এখন তা কমে ২ দশমিক ৫-এর নিচে নেমেছে। অনুপাত কমার অর্থ হলো সরকারি বন্ডের দাম কমলেও লোকসান সামাল দেয়ার সক্ষমতা আগের তুলনায় বেড়েছে।
ফ্রান্সের বড় ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আগের সংকটের তুলনায় ভালো। অ্যাক্সিওম অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ডেভিড বেনামু এবং উইজডমট্রির শেয়ারবাজার কৌশলবিদ আনিকা গুপ্তার হিসাব অনুযায়ী, বড় ফরাসি ব্যাংকগুলোর সর্বোচ্চ মানের মূলধনের প্রায় ১৫-৩০ শতাংশ নিজ দেশের সরকারি ঋণে বিনিয়োগ করা আছে। ২০১১-১২ সালে ইতালির ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এ অনুপাত ১০০ শতাংশের বেশি ছিল।
লোকসান এড়ানোর সুযোগ থাকলেও রয়েছে ঝুঁকি
সরকারি বন্ডের দাম কমলেও তাৎক্ষণিক লোকসান দেখানোর চাপ কমাতে ব্যাংকগুলো হিসাবের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এনেছে। ইবিএর তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোজোনের ব্যাংকগুলোর মোট সরকারি বন্ডের ৪১ শতাংশ ছিল নিজ দেশের বন্ড। ২০১৩ সালে এ হার ছিল ৫০ শতাংশের বেশি।
এছাড়া ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা বন্ডের ৬০ শতাংশ এখন ক্রয়মূল্য অনুযায়ী হিসাব করা হয়। আগের তুলনায় এ হার তিন গুণ। যেসব বন্ড মেয়াদ পর্যন্ত ধরে রাখার জন্য কেনা হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে বাজারদর কমলেও নির্দিষ্ট শর্তে তাৎক্ষণিক লোকসান দেখাতে হয় না। তবে নগদ অর্থের প্রয়োজন হলে ব্যাংককে এসব বন্ড বিক্রি করতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হয়।
মর্নিংস্টার ডিবিআরএসের বিশ্লেষক মারিয়া রিভাস বলেন, ‘হিসাবের খাতায় লোকসান না দেখালেও বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের বন্ডের প্রকৃত অবস্থা কীভাবে দেখছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি সাময়িক হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় প্রভাব নাও পড়তে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হলে ঝুঁকি নিয়ে তাদের ধারণা বদলে যেতে পারে।’
ঋণের খরচ বাড়লে চাপ বাড়বে
সরকারি বন্ডের সুদহার বাড়লে ব্যাংকগুলোর নিজেদের ঋণ নেয়ার খরচও বেড়ে যায়। কারণ আর্থিক বাজারে ঋণ নেয়ার সময় ব্যাংকগুলোকে সাধারণত সরকারি ঋণের সুদহারের চেয়ে বেশি সুদ দিতে হয়। পুরনো ঋণ পুনঃঅর্থায়নের সময় এ খরচ বাড়লে মুনাফায় চাপ পড়ে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পাইকারি ঋণবাজার থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নেয় ফ্রান্সের ব্যাংকগুলো। ফলে সুদহার দীর্ঘদিন উঁচু থাকলে তাদের খরচও বাড়বে। তবে গ্রিসের পিরেয়াস ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টোস মেগালু মনে করেন, আগের সংকটের মতো বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি এখন কম। তার মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, নীতিনির্ধারক ও ব্যাংকগুলো এখন সংকট মোকাবেলায় বেশি প্রস্তুত। ব্যাংকগুলো নিয়মিত ঝুঁকি যাচাইও করছে।
সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর মূলধন ও তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী হলেও সরকারি ঋণের চাপ থেকে তারা পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত নয়। বন্ডবাজারের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ঋণের খরচ বাড়বে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমতে পারে এবং ব্যাংকের মুনাফায় চাপ তৈরি হবে। তাই বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িক থাকে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নেয়, সেটিই এখন ইউরোপের ব্যাংক খাতের জন্য বড় প্রশ্ন।