বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ সংকট আগামী বছরেও অব্যাহত থাকতে পারে। ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) পর্যন্তও এ সংকট কাটার সম্ভাবনা কম। বিভিন্ন অঞ্চলে ডিজেলের মজুদ কমে আসা এবং সংরক্ষণাগার ব্যবহারের চিত্র থেকে এমন আভাস পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) ও দ্য ট্যাংক টাইগারের সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর রয়টার্স।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরবরাহের ঘাটতি দ্রুত কাটার লক্ষণ নেই। ফলে উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের চাপও আরো কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ডিজেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বাজারে পৌঁছতে পারছে না। এতে বিভিন্ন দেশে ডিজেলের মজুদ কমে ঐতিহাসিক নিম্নস্তরে নেমেছে। একই সময়ে দামও বেড়ে রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছে। কৃষি, উৎপাদন শিল্প ও ভারী পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার বেশি। ফলে জ্বালানিটির সংকট সরাসরি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রভাব এরই মধ্যে খুচরা বাজারেও দেখা গেছে। চলতি মাসে দেশটিতে খুচরা ডিজেলের দাম প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৬ ডলারের ওপরে উঠেছে। এতে ব্যয় বেড়েছে কৃষক ও ট্রাকচালকদের। পরিবহন ও কৃষির মতো খাতে জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় পণ্যের উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানি সংরক্ষণের বাজারেও এ সংকটের স্পষ্ট প্রভাব ফুটে উঠেছে। উত্তর আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের শোধনাগার এবং ব্যবসায়ীরা জমানো জ্বালানির ট্যাংক ইজারা নেয়ার চুক্তি আর নবায়ন করছেন না। কারণ সংরক্ষণ করার মতো পর্যাপ্ত ডিজেলই অবশিষ্ট নেই।
সংরক্ষণাগার বাজারের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান দ্য ট্যাংক টাইগারের তথ্যানুযায়ী, উত্তর আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ইজারার জন্য খালি পড়ে থাকা ডিজেল ট্যাংকের ধারণক্ষমতা জুনের ১১ মিলিয়ন বা ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল থেকে বেড়ে অক্টোবরে ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। চার বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ পরিমাণ খালি ট্যাংকের রেকর্ড।
দ্য ট্যাংক টাইগারের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা স্টিভেন বারসামিয়ান রয়টার্সকে বলেন, ‘ডিজেল মজুদ কম থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান পুরনো সংরক্ষণাগারের ইজারা নবায়ন করতে চাইছে না। সাধারণত একটি সংরক্ষণ ট্যাংক ছয় মাস থেকে এক বছর মেয়াদে ইজারা নেয়া হয়। কিন্তু বাজারে রাখার মতো জ্বালানি না থাকলে এসব ট্যাংকের জন্য অর্থ ব্যয় করার আগ্রহও কমে যায়।’
যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল মজুদের পরিস্থিতিও বেশ সংকটপূর্ণ। দেশটির ইআইএর তথ্যানুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল মজুদ কমে ১০ কোটি ৭৯ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। বছরের এ সময়ের হিসাবে ১৯৮২ সালে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর এটি সর্বনিম্ন মজুদ।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এ দুই চিত্র একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায় ডিজেলের সরবরাহ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যবসায় বাড়ছে জ্বালানি বাবদ ব্যয়ের চাপ
ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু জ্বালানি ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নেই। পরিবহননির্ভর বিভিন্ন ব্যবসায়ও এর প্রভাব পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইকোবক্স ডাম্পস্টার জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কিছু পরিবর্তন এনেছে। প্রতিষ্ঠানটি যেখানে সম্ভব ছোট ট্রাক ব্যবহার করছে। পাশাপাশি একই এলাকার একাধিক ডেলিভারি ও সংগ্রহের কাজ একসঙ্গে করার চেষ্টা করছে।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক ডেভিড গ্যারিগাস বলেন, ‘এখন একটি অপ্রয়োজনীয় ট্রাক চলাচলের খরচও আগের তুলনায় অনেক বেশি। ডিজেলের সংকট তাই শুধু জ্বালানি সরবরাহের বিষয় না। কৃষি, উৎপাদন শিল্প, পরিবহন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো খাতেও এর প্রভাব পড়ছে। এসব খাতে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়লে পরিচালন ব্যয়ও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সে বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্য ও সেবার দামে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।’
যুক্তরাষ্ট্রে মজুদ আরো কমার পূর্বাভাস
যুক্তরাষ্ট্রের ইআইএও মনে করছে, দেশটির ডিজেলের মজুদ দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা কম। চলতি মাসের শুরুতে সংস্থাটি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল হিসেবে বিক্রি হওয়া ডিস্টিলেট ফুয়েল অয়েলের মজুদ সেপ্টেম্বরে ১০ কোটি ব্যারেলের নিচে নেমে যেতে পারে।
ইআইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত এবং ২০২৭ সালের বেশির ভাগ সময় যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্টিলেট ফুয়েলের মজুদ পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন স্তরের নিচে থাকতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান সংকট দ্রুত কাটার পরিবর্তে আগামী বছরজুড়েও বাজারে সরবরাহের চাপ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ডিজেলকে ডিস্টিলেট ফুয়েলের একটি প্রধান ধরন হিসেবে ধরা হয়। কৃষি ও পরিবহনসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অনেক খাতে এ জ্বালানি ব্যবহার হয়। ফলে মজুদ কমে গেলে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে।
ইউরোপ ও এশিয়ায়ও কম মজুদ
ডিজেলের সরবরাহ সংকট শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপেও মজুদ তুলনামূলক কম রয়েছে। ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ আমস্টারডাম-রটারডাম-অ্যান্টওয়ার্প বা এআরএ অঞ্চলে ডিজেলের মজুদও পাঁচ বছরের গড়ের নিচে রয়েছে।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী, জুলাইয়ে এ অঞ্চলের ডিজেলের মজুদ পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় ১৬ শতাংশ কম ছিল। এআরএ অঞ্চল ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সংরক্ষণ, পরিশোধন ও বাণিজ্য কেন্দ্র। ফলে সেখানে মজুদ কম থাকার বিষয়টি ইউরোপের বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্য কেন্দ্র সিঙ্গাপুরেও মজুদের চিত্র খুব স্বস্তিদায়ক নয়। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে দেশটির মোট ডিস্টিলেট ফুয়েলের মজুদ গড়ে প্রায় ৮২ লাখ ব্যারেল ছিল। ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এ পরিমাণ কাছাকাছি। তবে ২০২৫ সালের গড় মজুদ ছিল প্রায় ৯৬ লাখ ব্যারেল। অর্থাৎ গত বছরের গড়ের তুলনায় মজুদ এখনো কম।
সব মিলিয়ে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোয় ডিজেলের মজুদের ওপর চাপ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মজুদ ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে নেমেছে। ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রে মজুদ পাঁচ বছরের গড়ের চেয়ে কম। এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র সিঙ্গাপুরেও গত বছরের গড়ের তুলনায় মজুদ কম।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহে বিঘ্নের পাশাপাশি কমে যাওয়া মজুদও বাজারকে চাপে রাখছে। ফলে আগামী বছরেও ডিজেলের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি ব্যবসা এবং অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকতে পারে।