দেশের জ্বালানি খাত ও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) এ অনুষ্ঠানের আয়োজক।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাত অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আগের সরকারের কাছ থেকে পাওয়া রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা ও বিদেশে অর্থ পাচারের মতো সংকট কাটিয়ে উঠতে বর্তমান সরকার কাজ করছে।’
সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রথম দুই বছরের মধ্যে দেশের জ্বালানি খাত ও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে আনা হবে। তৃতীয় বছরে গতি ফিরবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে পুরো অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।’
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে পূর্ণাঙ্গ করছাড় ও প্রণোদনা দেয়া হয়েছে জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বাসাবাড়ি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ স্বাভাবিক ট্যারিফের চেয়ে বেশি দামে কেনার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।’
গ্যাস সংকট মোকাবেলায় নতুন তিন-চারটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘অফশোর ও অনশোর গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমও এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। চুক্তিভিত্তিক অনুসন্ধানের পাশাপাশি বাপেক্সকে শক্তিশালী করে ১৫০টি কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে।’
মাতারবাড়ীর পাশাপাশি খুলনার কাছে ২০ মিটার ড্রাফটের একটি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সেখানে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল ও এলএনজি খালাসের সুবিধাসহ আধুনিক টার্মিনাল এবং জ্বালানি হাব গড়ে তোলা হবে। এতে কোরীয়, চীনা ও যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা যুক্ত হচ্ছেন।’
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম। তিনি বলেন, ‘আমদানীকৃত ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিদ্যুৎ খাতে আমদানিনির্ভরতা ২০২০-২১ অর্থবছরের ৫০ শতাংশ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৫ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে বায়োমাস ছাড়া প্রাথমিক জ্বালানিতে আমদানিনির্ভরতা ৪৭ দশমিক ৭ থেকে বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।’ এছাড়া নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে ২০৩৬ সাল নাগাদ দেশের অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ প্রায় নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেন এ জ্বালানি বিশ্লেষক।
জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় শফিকুল আলম দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত বরাদ্দ, ভোলায় প্রমাণিত এক ট্রিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস ব্যবহারের অবকাঠামো নির্মাণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘গ্যাসের সিস্টেম লস ২ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারলে বছরে ৬০ থেকে ১০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ এলএনজি আমদানির ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব। এছাড়া ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আঞ্চলিক জলবিদ্যুৎ বাণিজ্য বাড়ানো গেলে ২০৩০ সালের পরও সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানির বাড়তি চাহিদা মেটানো যাবে।’
এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমানের সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু জিওং, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ম তামিম, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ এবং এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক। এছাড়া অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন এফআইসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট রুপালী হক চৌধুরী ও পরিচালক শাদাব আহমেদ খান।