চীনের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা

বৈশ্বিক পণ্যবাজারের যেসব খাতে বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা

বেইজিং এখন আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের মতো লক্ষ্যমাত্রাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এতে সামনের দিনগুলোয় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও মূল্যের ভারসাম্য বড় ধরনের ওলটপালট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে

চীনের বার্ষিক সংসদীয় অধিবেশন শুরু হচ্ছে আজ। এ অধিবেশনে আগামী পাঁচ বছরের নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনার রূপরেখা উন্মোচন করবে বেইজিং। বিশ্বের বৃহত্তম আমদানিকারক ও ভোক্তা দেশ হওয়ায় চীনের এ নীতিমালার ওপরই নির্ভর করছে বৈশ্বিক পণ্যবাজারের ভবিষ্যৎ। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, শিল্প ধাতু ও কৃষিপণ্যের মূল্যের গতিপথ বদলে দিতে পারে। খবর রয়টার্স।

জ্বালানি খাতে দ্বিমুখী নীতি

চীনের নতুন পরিকল্পনায় জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করতে পারে বেইজিং। তবে বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা ভোক্তা দেশটি এখনই এ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাচ্ছে না। বার্লিনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক মেরিকসের বিশ্লেষক জোহানা ক্রেবস জানান, অর্থনৈতিকভাবে লড়াই করা বিশাল এ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কয়লা শিল্পের মতো খাতকে রাতারাতি গুরুত্বহীন করার ঝুঁকি বেইজিং নেবে না। ফলে বিশ্ববাজারে কয়লার চাহিদা বা বাণিজ্যে নিকট ভবিষ্যতে বড় ধসের সম্ভাবনা নেই।

অন্যদিকে, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের পথে হাঁটছে বেইজিং। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন রেকর্ড উচ্চতায় থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানোর আভাস থাকতে পারে এ পরিকল্পনায়।

তবে প্রাকৃতিক গ্যাসের চিত্র ভিন্ন। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিনোপেক ও সিএনপিসির গবেষকদের মতে, আগামী পরিকল্পনার মেয়াদকালে চীনে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা গড়ে ৫ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি বাণিজ্যে বড় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শিল্প ধাতুর বাজারে অস্থিরতার শঙ্কা

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তামা ও ইস্পাত ভোক্তা চীন এখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা ও মজুদ ব্যবস্থার দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে তামার বাণিজ্যিক মজুদ গড়ে তোলার বিষয়ে বেইজিং একটি বিরল ঘোষণা দিয়েছে। এ উদ্যোগ সফল হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার এবং দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চীনের বিশালাকার ইস্পাত শিল্পের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে যা ফ্যান নেইজুয়ান বা অশুভ প্রতিযোগিতা হিসেবে পরিচিত, তা মোকাবিলায় নতুন পরিকল্পনায় কঠোর নীতিমালা আসতে পারে। নতুন ইস্পাত কারখানা স্থাপন বা আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে কার্বন নিঃসরণের শর্ত জুড়ে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইস্পাত খাত এখন চীনের জাতীয় কার্বন বাজারের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বড় প্রভাব পড়ার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ইস্পাতের দর অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষিপণ্য

চীন এখন আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার মিশনে নেমেছে। নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রিভিয়াম চায়নার পরিচালক ইভেন পে জানান, সয়াবিন ও গোটাশস্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রাজিলের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে চায় বেইজিং। দেশটির নতুন পরিকল্পনায় পশুখাদ্যে সয়াবিনের ব্যবহার কমানো এবং আমদানির উৎস বৈচিত্র্যায়নের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক শস্য বাজারে বড় ক্রেতা হিসেবে চীনের প্রভাব এবং বৈশ্বিক দামে বড় পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে।

বেইজিং এখন আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের মতো লক্ষ্যমাত্রাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এতে সামনের দিনগুলোয় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও মূল্যের ভারসাম্য বড় ধরনের ওলটপালট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আরও