২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাস

অপ্রচলিত বাজারেও নিম্নমুখী তৈরি পোশাকের রফতানি

ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, মার্কিন শুল্কনীতি ও রফতানিতে চীন-ভারতের আগ্রাসী কৌশলসহ নানা কারণে বৈশ্বিক রফতানি বাজারে চলছে মন্দা।

ফলে দেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাকের বাজারও নিম্নমুখী। তবে চীন, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো কয়েকটি অপ্রচলিত বাজারে রফতানি কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও অধিকাংশ দেশের ক্ষেত্রেই তা নিম্নমুখী। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে প্রকাশিত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসের (জুলাই ’২৫-ফেব্রুয়ারি ’২৬) পরিসংখ্যানে এ চিত্র দেখা গেছে।

দেশের পোশাক রফতানির বাজারকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। প্রধান বা প্রচলিত বাজারের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। রফতানীকৃত পোশাকের প্রায় ৮৫ শতাংশই এসব দেশে যায়। এর বাইরে বাকি দেশগুলোকে পোশাক রফতানির জন্য নন-ট্র্যাডিশনাল বা অপ্রচলিত বাজার হিসেবে ধরা হয়।

ইপিবির সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, ইইউভুক্ত দেশগুলোয় চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে পোশাক রফতানি কমেছে ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এ সময়ে দেশগুলোতে পোশাক রফতানি হয়েছে ১ হাজার ২৬৮ কোটি ৬৩ লাখ ডলার মূল্যের। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছে ১ হাজার ৩৪২ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক।

একক দেশ হিসেবে দেশের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। মোট রফতানীকৃত পোশাকের প্রায় ২০ শতাংশই যায় দেশটিতে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি কমেছে। বছরের প্রথম আট মাসে দেশটিতে পোশাক রফতানি হয়েছে প্রায় ৫০৩ কোটি ডলারের; যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ৫০৬ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের পণ্য। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পোশাক রফতানি কমেছে দশমিক ৭৪ শতাংশ।

ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রে কমলেও দেশের অন্যতম পোশাক রফতানির বাকি দুই প্রচলিত বাজার কানাডা ও যুক্তরাজ্যে রফতানি বেড়েছে যথাক্রমে ৩ দশমিক শূন্য ৮ ও ১ দশমিক ২২ শতাংশ হারে।

এ চারটি বাজারের বাইরে বাকি দেশগুলোকে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির অপ্রচলিত বাজার ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, চীন ও ভারতের মতো দেশগুলো। ইপিবির তথ্য বলছে, অপ্রচলিত বাজারের কয়েকটি দেশে পোশাক রফতানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নিম্নমুখী। অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে সবচেয়ে বড় জাপান। দেশটিতে গত আট মাসে পোশাক রফতানি কমেছে ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এ সময়ে রফতানি হয়েছে ৭৯ কোটি ৪২ লাখ ডলারের পোশাক; যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ৮৩ কোটি ৯৪ লাখ ডলারের পণ্য।

অপ্রচলিত বাজারের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ অস্ট্রেলিয়া। দেশটিতে এক বছরের ব্যবধানে পোশাক রফতানি কমেছে ১২ দশমিক ৬৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশটিতে ৫০ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হলেও গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৮৫ কোটি ২২ লাখ ডলার।

অপ্রচলিত বাজারের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ ভারতে রফতানি কমেছে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। দেশটিতে চলতি অর্থবছরে ৪৩ কোটি ১৬ লাখ ডলারের বিপরীতে গত অর্থবছরের একই সময়ে পণ্য রফতানি হয়েছিল ৪৭ কোটি ৮১ লাখ ডলারের পোশাক।

প্রবৃদ্ধির হারে অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রফতানি কমেছে রাশিয়ায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশটিতে পোশাক রফতানি কমেছে ২৯ দশমিক ১৭ শতাংশ। এ সময়ে রফতানি হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ৩৯ লাখ ডলারের পণ্য; যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ২১ কোটি ৭৩ লাখ ডলারের পণ্য। এছাড়া তুরস্কতে ২৪ দশমিক ৩৮, মেক্সিকোতে ১৬ দশমিক ৬৮ ও কোরিয়াতে রফতানি কমেছে ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ করে।

বিপরীতে অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে চীনে, যা প্রায় ২১ দশমিক ৫১ শতাংশ। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১৪ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের পোশাক রফতানির বিপরীতে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এছাড়া সৌদি আরবে ২১ দশমিক ৪৬, মালয়েশিয়ায় ১৬ দশমিক ৪, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৫ দশমিক ৬৮, ব্রাজিলে ১১ দশমিক ৫ ও দক্ষিণ আফ্রিকায় পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ করে। এ দেশগুলোয় ৮ কোটি থেকে ১৯ কোটি ডলার পর্যন্ত পণ্য রফতানি হয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে।

সব মিলিয়ে অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধি কমেছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ বাজারে চলতি অর্থবছরে ৪২৪ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হলেও গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানির আকার ছিল ৪৫২ কোটি ৭৮ লাখ ডলার।

বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীলতার মধ্যে প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি অপ্রচলিত বাজারেও পিছিয়ে পড়ছে তৈরি পোশাক খাত। এজন্য দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও দায়ী বলে মনে করেন তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রচলিত-অপ্রচলিত সব বাজারেই আমাদের রফতানি নিম্নমুখী। মূলত যুদ্ধ-বিগ্রহের মতো বৈশ্বিক অস্থিরতা ও শুল্কবৃদ্ধির কারণে রফতানি থমকে গেছে। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত সুদহারসহ দেশের ব্যবসা পরিবেশের বেহাল অবস্থা। শুল্কের কারণে হয়তো প্রধান রফতানির বাজারের প্রবৃদ্ধি কমেছে। কিন্তু দেশে অনেকগুলো কারখানা বন্ধ থাকায় আমরা ঠিকমতো পোশাক রফতানি করতে পারছি না। এর প্রভাব পড়েছে অপ্রচলিত বাজারেও।’

আরও