পিপিআরসির ভার্চুয়াল সেমিনারে বক্তারা

সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার ও কার্যকর ইকোসিস্টেম

সৃজনশীল অর্থনীতিকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে শুধু বাজেটে বরাদ্দই যথেষ্ট নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন, কার্যকর নীতিগত সংস্কার, কর সুবিধা, কপিরাইট সুরক্ষা, উপযুক্ত লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) আয়োজনে গতকাল সৃজনশীল অর্থনীতিসংক্রান্ত এক অনলাইন আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। একই সঙ্গে ফলাফলভিত্তিক মানদণ্ড নির্ধারণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা। ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি: স্লোগান অর আনট্যাপড পটেনশিয়াল’ শীর্ষক এ ভার্চুয়াল সেমিনার সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

আলোচনায় জানানো হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রথমবারের মতো সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য ৮০০ কোটি টাকার কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা সরাসরি বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে আরো ৫০০ কোটি টাকা সংস্থানের পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে জিডিপিতে খাতটির অবদান বৃদ্ধি, প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চলচ্চিত্র, সংগীত, প্রকাশনা, ডিজিটাল কনটেন্ট ও ডিজাইন খাতে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বক্তারা জানান, বাংলাদেশের সৃজনশীল খাতগুলোয় কখনো প্রতিভার অভাব হয়নি। কিন্তু এসব খাতকে প্রকৃত অর্থনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন খাত হিসেবে খুব কমই বিবেচনা করা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ কাজ চলেছে নীতিগত সহায়তার পরিবর্তে ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও আবেগের জোরে। সরকারের সম্পৃক্ততাও একইভাবে ছিল অসামঞ্জস্যপূর্ণ—সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রায়ই শিল্পনীতির পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। পাশাপাশি ওটিটি করনীতি, কপিরাইট ও প্রকাশনাসংক্রান্ত নিয়ন্ত্রক কাঠামোগুলো এ খাতগুলোর প্রকৃত কার্যপ্রণালির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনি।

সেমিনারে চলচ্চিত্র নির্মাতা তানিম নূর বলেন, ‘চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য নির্দিষ্ট করনীতি ও কর অব্যাহতির মতো প্রণোদনা দেয়া হলে দেশীয় চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।’

অন্যদিকে ওটিটি প্লাটফর্ম চরকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রেদওয়ান রনি বলেন, ‘দেশীয় ওটিটি খাতের জন্য এখনো আলাদা নীতিমালা না থাকায় স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে। চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কর ও লাইসেন্সিং নীতির সংস্কার জরুরি। নেটফ্লিক্স ও অ্যামাজনের মতো বৈশ্বিক প্লাটফর্মগুলো বাংলাদেশী দর্শকদের কাছ থেকে আয় করলেও দেশীয় ওটিটি প্লাটফর্মগুলোর মতো একই কর বাধ্যবাধকতার আওতায় পড়ে না। ফলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, ‘দেশে সৃজনশীল প্রতিভার অভাব না থাকলেও সেই প্রতিভাকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের মতো ইকোসিস্টেম এখনো গড়ে ওঠেনি।’ এজন্য সরকারের কাঠামোগত সংস্কার এবং শিল্পী ছাড়াও এ খাতের সঙ্গে যুক্ত পুরো কর্মীবাহিনীকে গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

নাট্যকার ও পরিচালক বাকার বকুল বলেন, ‘বাংলাদেশে নাটক এবং বৃহত্তর অর্থে শিল্পকলা কখনই প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য বহনকারী পণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়নি। বেশির ভাগ শৈল্পিক কাজ পরিচালিত হয় ব্যক্তিগত ভালোবাসার তাগিদে। ফলে টেকসই একটি শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ খুব কমই নেয়া হয়েছে।’ তার ভাষায়, ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রায়ই শিল্পকলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা লালনের পরিবর্তে রাজনৈতিক বা প্রচারমূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে।’

ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রকাশক মাহরুখ মহিউদ্দিন প্রকাশনা খাতকে দেশের সবচেয়ে অবহেলিত খাত হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘জাতীয় গ্রন্থনীতি সঠিকভাবে হালনাগাদ করা হয়নি এবং আমাদের প্রকাশনা শিল্পকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার জন্য পর্যাপ্ত উদ্যোগ আমরা দেখিনি। যদিও বর্তমান সরকারের আমলে আমরা কিছুটা অগ্রগতির আভাস পেতে শুরু করেছি।’

কপিরাইট প্রসঙ্গে মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘বিদ্যমান আইন বাস্তবে খুব কমই প্রয়োগ হতে দেখা যায়, যা এ খাতের অনেককে হতাশ করে তুলেছে।’ তিনি ডিজিটাল ও মুদ্রণ পাইরেসিকে এ খাতের জন্য একটি গুরুতর ও চলমান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন, যা দুর্বল আইন প্রয়োগের কারণে আরো বেড়েছে বলেও মন্তব্য করেন।

ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদ বিন আব্দুস সালাম বলেন, ‘হস্তশিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে মান সনদ, কমপ্লায়েন্স ও শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং অপরিহার্য।’

সেমিনারের সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে করনীতি, রয়্যালটি বণ্টন, কপিরাইট সুরক্ষা ও লাইসেন্সিংকে নীতিগত অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে টেকসই ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।’

আরও