পশ্চিম আফ্রিকায় সহিংসতার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। বাড়িঘর ও ফসলি জমি ফেলে পালাতে বাধ্য হচ্ছে বাসিন্দারা। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খাবারের দাম। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে পড়ছে। অপুষ্টির মুখে রয়েছে আরো লাখ লাখ শিশু। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম ও কেন্দ্রীয় আফ্রিকায় ক্রমবর্ধমান খাদ্যমূল্য ও অব্যাহত সহিংসতায় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশ ক্ষুধার প্রকোপ বেড়েছে। এমন বিপর্যয় রোধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের সংস্থাটি। খবর ব্লুমবার্গ।
একটি বিবৃতিতে ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, ওই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষ খাদ্য অনিরাপত্তার মুখোমুখি হতে চলেছে। ৩ কোটি ১০ লাখেরও বেশি লোক খাদ্য অনিরাপত্তা এবং পরবর্তী ফসল কাটার আগে আগামী জুন থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে এ মানুষগুলো নিজেদের জন্য খাবারের সংস্থান করতে ব্যর্থ হবে। এ সংখ্যাটি গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
পুরো অঞ্চলে খাদ্যমূল্য নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। চাল ও গমের মতো স্থানীয় পণ্যগুলোর দাম পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে এবং কিছু অঞ্চলে এ বৃদ্ধির হার ২০০ শতাংশেরও বেশি। কভিড-১৯ মহামারীর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রভাবে এমনটা ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বাণিজ্য, পর্যটন, অনানুষ্ঠানিক ক্রিয়াকলাপ ও প্রবাসী আয় হ্রাসের কারণে লোকজনের আয় কমে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
সিয়েরালিয়নে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানীকৃত পণ্যগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় পণ্যগুলোর দামকেও ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশটির প্রধান খাদ্য চালের দাম (স্থানীয় ও আমদানীকৃত) গত পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় ৬০-৭০ শতাংশ বেড়ে গেছে। পশ্চিম আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে সহিংসতা বেড়ে এমন আকার ধারণ করেছে যে মানুষ তাদের ঘরবাড়ি থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। ছেড়ে দিতে হয়েছে তাদের জমি এবং বন্ধ হয়েছে আয়ের উৎসগুলো। ফলে উত্তর নাইজেরিয়া, কেন্দ্রীয় আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র এবং ক্যামেরুনের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে খাদ্য অনিরাপত্তা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
এ অঞ্চলজুড়ে চলতি বছর পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১০ লাখ শিশু মারাত্মক অপুষ্টির মুখে রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেক শিশুই সাহারার উত্তরের সাহেল অঞ্চলের। খাদ্য অনিরাপত্তা ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি এবং পুষ্টিকর খাবারের উচ্চমূল্য এ সংখ্যাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে। ডব্লিউএফপি এ বছর পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষকে সহায়তার পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে ৬৮ শতাংশ মানুষই সংকট ও জরুরি অবস্থার মধ্যে রয়েছে।
পশ্চিম আফ্রিকায় নিযুক্ত ডব্লিউএফপির আঞ্চলিক পরিচালক ক্রিস নিকোই বলেন, পশ্চিম আফ্রিকায় সহিংসতা এরই মধ্যে ক্ষুধা ও দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে খাবারের ক্রমবর্ধমান দাম লাখ লাখ মানুষকে ক্ষুধা ও হতাশার গভীরে ঠেলে দিচ্ছে। এমনকি খাবার পাওয়া গেলেও সাধ্যের মধ্যে না পাওয়ায় পরিবারগুলো তা কিনতে পারছে না। দাম বৃদ্ধির ফলে লাখ লাখ দরিদ্র পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে মৌলিক খাবার।
তিনি বলেন, বাজার স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত লাখ লাখ পরিবারের একমাত্র আশা হতে পারে খাদ্যসহায়তা। প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম এবং যতক্ষণ না আমরা আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী তহবিল সংগ্রহ করতে পারি, সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। ২০২১ সালে আমরা সহায়তা বন্ধের মতো পদক্ষেপে যেতে পারি না।
বোকো হারাম এক দশকের বেশি সময় ধরে নাইজেরিয়ায় বিদ্রোহ করছে। তাদের সঙ্গে কৃষক ও পশু খামারিদের সহিংসতা এ সংকটকে আরো জটিল করে তুলছে। ফলে মার্চে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ২৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় পরিচালিত খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির জন্য আগামী ছয় মাসে ৭৭ কোটি ডলারের প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ডব্লিউএফপি।