২১০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ

পিকেএসএফের সহায়তায় চার জেলায় ৩০ হাজার উদ্যোক্তা তৈরি

এসএম সোহান, পাবনা থেকে ফিরে

কারো কারখানায় যুক্ত হয়েছে নতুন মেশিন, কোথাও বাড়ছে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান, আবার কোনো কারখানায় উৎপাদন ব্যয় কমাতে বসেছে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা।

এক সময় ২০ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করা ব্যবসার এখন প্রায় কোটি টাকা মূলধন। ২০ জোড়া যন্ত্র ও ১০ শ্রমিক নিয়ে যাত্রা করা আরেক উদ্যোক্তার ব্যবসার আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে দেড়-দুই কোটি টাকায়। কারো কারখানায় যুক্ত হয়েছে নতুন মেশিন, কোথাও বাড়ছে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান, আবার কোনো কারখানায় উৎপাদন ব্যয় কমাতে বসেছে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এমন পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। প্রতিষ্ঠানটির ঋণ, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তায় পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী—এ চার জেলায় প্রায় ৩০ হাজার সফল উদ্যোক্তা তৈরি করেছে স্থানীয় সহযোগী সংস্থা ‘পাবনা প্রতিশ্রুতি’। এ কার্যক্রমের আওতায় প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়। ব্যবসা শুরু, যন্ত্র কেনা, উৎপাদন বাড়ানো ও ব্যবসার পরিধি সম্প্রসারণে এ অর্থ ব্যবহার করছেন উদ্যোক্তারা। পাবনার ক্ষুদ্র শিল্পে বিশেষত সুতা প্রসেসিং ও টুইস্টিং, লুঙ্গি এবং পোশাক তৈরির কারখানাগুলোয় এ সহায়তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। উদ্যোক্তারা নতুন যন্ত্র যুক্ত করছেন, বাড়াচ্ছেন উৎপাদন সক্ষমতা। এর সঙ্গে কর্মসংস্থানও হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ, সুতা, কাপড়ের রঙ ও অন্যান্য উৎপাদন উপকরণের মূল্য বাড়ায় ব্যবসার ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে ব্যবসা ধরে রাখা ও সম্প্রসারণে অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

উদ্যোক্তাদের সরাসরি ঋণ দেয় না পিকেএসএফ। স্থানীয় এনজিওগুলো সহযোগী সংস্থা হিসেবে এ অর্থায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। পাবনায় এ দায়িত্ব পালন করছে পাবনা প্রতিশ্রুতি। ঋণের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তাও দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ‘সাসটেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন (স্মার্ট)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র কারখানায় নবায়নযোগ্য শক্তি ও পরিবেশবান্ধব বা সবুজ কারখানা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

পাবনার সুতা ও বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তা সাদ্দাম হোসেনের ব্যবসার বিস্তারের সঙ্গে অর্থায়নের ভূমিকার একটি চিত্র পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘২০ জোড়া যন্ত্র ও ১০ জন শ্রমিক নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। প্রাথমিক বিনিয়োগ ছিল প্রায় ২০ লাখ টাকা। পরে ঋণ নিয়ে ধাপে ধাপে ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েছি। বর্তমানে আমার ব্যবসার আকার প্রায় দেড় থেকে ২ কোটি টাকা।’ তবে বিদ্যুৎ, সুতা ও রঙের মূল্যবৃদ্ধিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন এ উদ্যোক্তা। তার মতে, নতুন যন্ত্র, পর্যাপ্ত মূলধন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পেলে ব্যবসা আরো সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

স্বল্প ঋণ ও নিজস্ব উদ্যোগে ব্যবসা সম্প্রসারণের আরেক উদাহরণ পাবনার জবেলপুর গ্রামের শাজনাম পারভিন। এ উদ্যোক্তা প্রায় ১৬ বছর ধরে জরি-চুমকির পোশাক তৈরি করেন। তিনি বলেন, ‘মাত্র ২০ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছি। পরে পিকেএসএফের সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেই। প্রথমে ৫০ হাজার টাকা নিলেও ধাপে ধাপে তা বেড়ে ৬ লাখ টাকায় উন্নীত হয়।’ বর্তমানে শাজনাম পারভিনের ব্যবসার মূলধন প্রায় কোটি টাকা, যেখানে প্রায় ৭০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তার এ উদ্যোগের আওতায় প্রতিদিন ২০০০-২২০০টি থ্রি-পিস তৈরি করা হয়। এছাড়া গ্রামীণ নারীরা বাড়িতে থেকেই কাজের সুযোগ পাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে।

লুঙ্গি তৈরির কারখানাতেও পিকেএসএফের অর্থায়নের প্রভাব পড়েছে। তেমনই এক উদ্যোক্তা তাইয়েবা খাতুনের কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তায় সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে সোলার প্যানেল। এখানে উৎপাদিত লুঙ্গি পাবনা থেকে শাহজাদপুরের কাপড়ের হাটে যায়। সেখান থেকে প্রক্রিয়াজাত হয়ে পণ্য ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে।

পিকেএসএফের এ উদ্যোগে অর্থায়নের সঙ্গে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থাকেও যুক্ত করা হচ্ছে। মেসার্স এএমবি টুইস্টিং অ্যান্ড সুতা প্রসেসিং মিলের স্বত্বাধিকারী মো. শাহীন আলী ২০২৫ সালে ঋণ নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন। তার প্রতিষ্ঠানে তিন শিফটে প্রায় ৪০ জন শ্রমিক কাজ করেন। ঋণ সহায়তার পর তিনি সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছেন। পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, নারী শ্রমিকদের সুবিধা ও মাতৃদুগ্ধপান কর্নার রাখা হয়েছে।

পাবনা প্রতিশ্রুতির পরিচালক (ঋণ কার্যক্রম) মো. মনির হোসেন বলেন, ‘উদ্যোক্তাদের শুধু অর্থায়ন করাই প্রকল্পের লক্ষ্য নয়; উৎপাদন ব্যবস্থাকে পরিবেশবান্ধব, গ্রিন এনার্জির ব্যবহার এবং শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও এর অংশ। সৌরবিদ্যুৎ ও সোলার পাম্পের মতো প্রযুক্তির ব্যবহারে উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। কম বিদ্যুৎ, পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানো এবং বর্জ্য কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।’

অর্থায়নের পরও উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা, ব্যবসার অগ্রগতি, উৎপাদন এবং কর্মপরিবেশে কী পরিবর্তন এসেছে—এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়।

পিকেএসএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিয়ার রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যবস্থাকে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করতে কাজ করা হচ্ছে। জলবায়ু-সহনশীল ও সম্পদসাশ্রয়ী চর্চার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানো, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করাই এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।’

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় এবং বিশ্বব্যাংক ও পিকেএসএফের যৌথ অর্থায়নে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ‘স্মার্ট’ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত দেশের ৫৪টি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে ১৭টি উপখাতের ৭০টি উপপ্রকল্পে ৬৩ হাজার ৮৬২ জন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেয়া হয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য প্রক্রিয়াকরণ, কৃষি ও সেবা খাতের প্রায় ৮০ হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোগকে সহায়তা করা।

আরও