অনেক দেশের নীতিনির্ধারক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ ফিউচার্স কার্ভ বা মূল্যরেখা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিয়ে থাকেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী মাসগুলোর জন্য জ্বালানি তেলের দাম কম থাকার অর্থ এই নয় যে ব্যবসায়ীরা বাজারে বড় কোনো দরপতনের কথা ভাবছেন। এটি মূলত বর্তমান বাজারের তীব্র সংকটের একটি সাময়িক প্রতিফলন। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে গত দুই মাস আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে আটকে আছে। সরবরাহ সংকটের মধ্যেও মার্কিন হোয়াইট হাউজ জনগণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে যে বাজারে দ্রুতই জ্বালানি তেলের দাম কমে আসবে। ৪ মে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ফিউচার্স মার্কেটের তথ্য তুলে ধরে জানান, উচ্চমূল্য সাময়িক। কারণ তিন থেকে নয় মাস পরের সরবরাহের জন্য জ্বালানি তেলের দাম এখনই কম দেখাচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো মূল্যস্ফীতি ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সাজাতে এ ফিউচার্স কার্ভ পর্যবেক্ষণ করে। কিন্তু জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক সংকটের সময় এ বাজারকে ভবিষ্যৎ গণনার যন্ত্র বলা চলে না। আগাম বাজারে দাম আসলে এটি দেখায় না যে ভবিষ্যতে কী ঘটবে, বরং এটি প্রকাশ করে যে ক্রেতা ও বিক্রেতারা নিজেদের আর্থিক ঝুঁকি এড়াতে আজ কী দামে চুক্তি করতে রাজি আছেন।
অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো তাদের উত্তোলিত তেলের দাম নিশ্চিত করতে এ আগাম চুক্তি বিক্রি করে, যেন তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকে। অন্যদিকে তেল শোধনাগার বা রিফাইনারির মতো ক্রেতারা আকস্মিক দাম বাড়ার ধাক্কা থেকে বাঁচতে এবং জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ চুক্তি কেনে। বর্তমানে আগামী মাসগুলোর জন্য জ্বালানি তেলের দাম কম থাকার মূল কারণ হলো এ মুহূর্তে বাজারে জ্বালানি তেলের তাৎক্ষণিক বা ভৌত ঘাটতি অনেক বেশি। এটি মূলত বর্তমানের তীব্র চাহিদারই প্রতিফলন, কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও নিশ্চিত ভবিষ্যতের চিত্র নয়।
চলমান সংঘাত শুরুর পর থেকে জ্বালানি তেলের তাৎক্ষণিক দাম ৪৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিপরীতে চলতি বছরের ডিসেম্বরের চুক্তিতে দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশের কম। ২০২৭ সালের শেষের দিকের চুক্তিতে দাম বেড়েছে ২০ শতাংশেরও কম। মূলত তীব্র অস্থিরতার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ধরে রাখার খরচ ও ঝুঁকি অনেক বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা চড়া দামে আগাম জ্বালানি তেল কিনতে দ্বিধাবোধ করছেন। এছাড়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভয় রয়েছে যে যুদ্ধ হঠাৎ শেষ হলে হরমুজ প্রণালি খুলে যাবে। তখন বাজারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলের সরবরাহ বেড়ে গিয়ে সাময়িকভাবে দাম অনেক কমে যেতে পারে।
অতীত ইতিহাস থেকে দেখা যায়, বৈশ্বিক সংকটের সময় এ আগাম বাজার সঠিক পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় জ্বালানি তেলের দাম কমে প্রতি ব্যারেল ২০ ডলারে নেমে আসে। তখন আগাম বাজার ইঙ্গিত দিয়েছিল, পরবর্তী দুই বছরে দাম বড়জোর ৪২ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। অথচ ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বড় কোনো বৈশ্বিক যুদ্ধের সময় নিশ্চিত পূর্বাভাসের জন্য ফিউচার্স কার্ভের ওপর নির্ভর করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।