এ পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। সংস্থাটির মে মাসের বৈশ্বিক শস্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত, মিয়ানমার ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় উৎপাদনকারী দেশে ফলন নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার কারণেই এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। খবর দ্য বিজনেসলাইন।
ইউএসডিএর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ মৌসুমে বিশ্বজুড়ে চাল উৎপাদন কমে প্রায় ৫৩ কোটি ৮০ লাখ টনে নেমে আসতে পারে। এটি ২০১৫ সালের পর প্রথম বার্ষিক উৎপাদন হ্রাস। এর মাধ্যমে গত ১১ বছর টানা উৎপাদন বাড়ার যে ধারা ছিল, তা ভেঙে যেতে পারে। শীর্ষস্থানীয় উৎপাদনকারী দেশগুলোয় চাল উৎপাদন গত বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের টানাপড়েন তৈরি করবে।
বিশ্বের খাদ্য ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় চালকে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট খাদ্য চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশই পূরণ হয় চাল থেকে। ফলে এ গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় যেকোনো ধরনের সমস্যার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনিক খরচের ওপর। সাধারণত অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সামাজিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে চালের বাজার স্বাভাবিক থাকাটা বেশ জরুরি।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, আবহাওয়ার প্রতিকূলতা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মতো কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে যুক্ত হয়ে চালের বাজারে এ বড় পরিবর্তন আনছে। বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যাতে অস্থিতিশীল হয়ে না পড়ে, সেজন্য নীতিনির্ধারকরা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
এ সংকটের অন্যতম কারণ হলো জ্বালানি তেল ও রাসায়নিক সারের আকাশচুম্বী দাম। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে পণ্য পরিবহনের প্রধান রুটগুলো বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ধান চাষের জন্য প্রচুর পরিমাণে সারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে সারের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে অনেক কৃষকের পক্ষেই চাষের খরচ তোলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে জলবায়ুর বৈরিতা। বিশ্বের শীর্ষ চাল রফতানিকারক দেশ ভারতে এল নিনো আবহাওয়া চক্রের প্রভাবে এবার গড় বৃষ্টিপাত অনেক কম হতে পারে। ফলে প্রধান প্রধান কৃষি অঞ্চলে খরা দেখা দেয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ইউএসডিএ জানিয়েছে, উচ্চ চাহিদার কারণে মজুদ থাকা দেশগুলোর চাল থেকে ঘাটতি মেটাতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে এ পরিস্থিতির প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে। থাই সাদা চালের পাইকারি দাম গত মার্চের শেষের দিক থেকে প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (সিবিওটি) চালের আগাম দাম মাত্র এক সপ্তাহে ৮ শতাংশ বেড়েছে, যা দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক বৃদ্ধির রেকর্ড। এফএওর চালের মূল্য সূচকও ঊর্ধ্বমুখী, যা মূলত উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, বিশ্ববাজারে চালের সরবরাহ এভাবে কমতে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলো তীব্র মূল্যস্ফীতির মুখে পড়বে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারগুলোকে রফতানি নিষেধাজ্ঞা বা অতিরিক্ত ভর্তুকির মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।