তাইওয়ানে প্রথমবারের মতো কার্বন কর আদায় শুরু

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বড় পদক্ষেপ নিল তাইওয়ান।

দেশটিতে প্রথমবারের মতো বড় বড় কার্বন নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ‘কার্বন লেভি’ বা কার্বন কর আদায় শুরু হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় গঠিত একটি নতুন সরকারি তহবিলকে সচল করতেই উদ্যোগটি নেয়া হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে নিক্কেই এশিয়া।

তাইওয়ানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন প্রশাসনের মহাপরিচালক সাই লিন-ই জানান, যেসব বিদ্যুৎ, গ্যাস সরবরাহ ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বছরে ২৫ হাজার টনের বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে, তাদের এ কর দিতে হবে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানগুলো মোট কী পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করেছে, তার ওপর ভিত্তি করে অর্থ হিসাব করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘‌২০৫০ সালের মধ্যে তাইওয়ানকে পুরোপুরি কার্বনমুক্ত (নিট-জিরো) করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। এ রূপান্তরকে গতিশীল করতে ২০২৫ সালে মূলত কার্বন ফি ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। প্রথম দফায় দেশটির ২৪৭টি প্রতিষ্ঠান এ শুল্কের আওতায় এসেছে।’

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি টন কার্বন নিঃসরণের জন্য প্রতিষ্ঠানকে ৩০০ নিউ তাইওয়ান ডলার (প্রায় ৯ ডলার ৫৩ সেন্ট) দিতে হবে। তবে নিজস্ব উদ্যোগে কার্বন কমানোর পরিকল্পনা জমা দিলে বিশেষ ছাড় দেয়া হবে প্রতিষ্ঠানকে। সেক্ষেত্রে প্রতি টনে ৫০ বা ১০০ নিউ তাইওয়ান ডলার দিতে হবে।

দেশটির পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা সাই লিন-ই বলেন, ‘নিয়মটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন বড় কোম্পানিগুলো শুধু অলস বসে না থেকে নিজ থেকেই কার্বন নিঃসরণ কমাতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে তাইওয়ানের শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা যেন নষ্ট না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হয়েছে।’

চীনের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাইওয়ান জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আলোচনা বা বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোয় অংশ নিতে পারে না। তা সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনের এ লড়াইয়ে তাইওয়ানের ভূমিকা বিশ্বজুড়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ বর্তমান বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তি পণ্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহ বা সাপ্লাই চেইনের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে দ্বীপ রাষ্ট্রটি। তাই তাইওয়ানের পরিবেশগত যেকোনো সিদ্ধান্তের বড় প্রভাব পড়ে বিশ্বে।

কার্বন শুল্ক আদায়ের সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল, যখন তাইওয়ান পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। বিশেষ করে দেশটিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন বৃদ্ধির গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, এবার প্রায় ৪৫০ কোটি নিউ তাইওয়ান ডলার রাজস্ব আদায় হবে। এর মধ্যে প্রায় ৪০৫ কোটি ডলার সরাসরি চলে যাবে নতুন গঠিত ‘গ্রিনহাউজ গ্যাস রিডাকশন ম্যানেজমেন্ট ফান্ড’ বা গ্রিনহাউজ গ্যাস হ্রাস ব্যবস্থাপনা তহবিলে। এ তহবিলের অর্থ দিয়ে স্থানীয় সরকার ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশবান্ধব প্রকল্প, নিট-জিরো উদ্যোগের জন্য সুদে ভর্তুকি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সহায়তায় প্রকল্প চালানো হবে।

পাশাপাশি তাইওয়ান চলতি বছরেই ‘নিঃসরণ বাণিজ্য ব্যবস্থা’ বা এমিসন ট্রেডিং সিস্টেম পরীক্ষামূলকভাবে চালু করতে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে কার্বন ফি ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে ‘ক্যাপ-অ্যান্ড-ট্রেড’ (কার্বন বাণিজ্য) পদ্ধতিতে প্রবেশ করা। ফলে তাইওয়ানের কার্বন খরচ জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর সমপর্যায়ে চলে আসবে।

মোট জ্বালানির ৯০ শতাংশেরও বেশি আমদানির ওপর নির্ভর করে তাইওয়ান, যার সিংহভাগই তেল ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি। এর ওপর চীনের সম্ভাব্য সামরিক বা অর্থনৈতিক অবরোধের একটি বড় ঝুঁকি সবসময়ই রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর মতো উভয় সংকট সামাল দিতে তাইওয়ানের এ নতুন কার্বন শুল্ক ব্যবস্থা কতখানি সফল হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

আরও