সংবাদ সম্মেলনে ইস্পাত শিল্প মালিকদের দাবি

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে টনপ্রতি রড উৎপাদনে ব্যয় বাড়তে পারে সাড়ে ৩ হাজার টাকা

দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ টন রড উৎপাদন করা হয়। বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে রড উৎপাদনে টনপ্রতি ব্যয় বাড়তে পারে প্রায় ৩ হাজার ৫৬০ টাকা।

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এ ব্যয় গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। তাই বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ইস্পাত শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)। রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান সংগঠনটির নেতারা।

এ সময় বিএসএমএ সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দেশের ইস্পাত শিল্প ইতিহাসের অন্যতম সংকটকাল অতিক্রম করছে। নির্মাণ খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা, বাজারে চাহিদা হ্রাস, উচ্চ সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন, গ্যাস সরবরাহ সংকটসহ নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এ খাত। এর মধ্যে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে প্রতি টন রডের দাম বাড়তে পারে গড়ে ১ হাজার ৭৮৫ টাকা। এছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুলসহ অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধির কারণে টনপ্রতি রডের দাম দাঁড়াতে পারে ৩ হাজার ৫৬০ টাকায়।’

তিনি দাবি করেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এ অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তাদের ওপর স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। কারণ তাতে বিক্রি কমে যাবে। ফলে বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ কোম্পানিগুলোকে বহন করতে হবে। সেটি হলে শিল্প-কারখানা আরো রুগ্‌ণ হবে। ব্যাংক ঋণের কিস্তি দিতে পারবে না। বেকারের সংখ্যা বাড়বে।

বিএসএমএ সভাপতি আরো বলেন, ‘ইস্পাত খাতের কারখানাগুলো গ্রিড থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ নিয়ে থাকে। ফলে কোনো সিস্টেম লস, ট্রান্সমিশন বা ডিস্ট্রিবিউশন লস নেই। তার পরও ডিমান্ড চার্জ, পাওয়ার ফ্যাক্টর চার্জ, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও অন্যান্য মাশুলের মাধ্যমে এ খাতের ওপর ক্রমাগত অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানো হচ্ছে।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে ৪০টি আধুনিক স্টিল মিল এবং দেড় শতাধিক রি-রোলিং মিল রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ টন। তবে দেশের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ টন। ফলে অধিকাংশ কারখানা বর্তমানের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম ব্যবহার করছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের বাড়তি মূল্য কার্যকর হলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে দাবি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের।

বিএসএমএ সভাপতি বলেন, ‘আমরা বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন। তবে এ খাতের কাঠামোগত অদক্ষতা, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার আর্থিক বোঝা উৎপাদনশীল শিল্প খাতের ওপর চাপিয়ে দেয়া কোনো টেকসই বা কার্যকর সমাধান হতে পারে না। এতে শিল্প উৎপাদন কমবে, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, কর্মসংস্থান ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং দেশের শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরো দুর্বল হয়ে পড়বে।’

বিদ্যুতের বাড়তি দাম প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিল্প টিকে থাকলেই কেবল অর্থনীতি বাঁচবে। আমরা শুনছি, সামনের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ইস্পাত খাতে নতুন কর বসানোর পরিকল্পনা করছে। এটি হলে রডের দাম আরো বাড়বে। কিন্তু যারা কিনবে, তাদের তো সক্ষমতা নেই। সেজন্য বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করে পূর্ববর্তী মূল্যহার পুনর্বহাল করা জরুরি।’

সংবাদ সম্মেলনে বিএসএমএ মহাসচিব সুমন চৌধুরী বলেন, ‘লোকসান দিয়ে শিল্প-কারখানা চালু রেখেছেন উদ্যোক্তারা। সরকারের উচিত আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসা। ব্যবসা-বাণিজ্যের সমস্যাগুলোর কীভাবে সমাধান করা যায়, এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া দরকার।’

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪২ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ খাতের এসব চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা দরকার। ক্যাপাসিটি চার্জ থেকে অর্থনীতিকে বাঁচাতে হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বিএসএমএর সাবেক সভাপতি মানোয়ার হোসেন; প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ; সহসভাপতি ফুরকান মোহাম্মদ এন হোসেন, মো. রেজাউল করিম (রাজু) ও মারুফ মহসিন এবং যুগ্ম সম্পাদক মো. জাকারিয়া।

উল্লেখ্য, চলতি মাসের শুরুতে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি করে সরকার। আর গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ ও সঞ্চালন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

আরও