জলবায়ুবিষয়ক গবেষণায় বাজেট কমিয়েছে মার্কিন সরকার। বিষয়টিকে বড় ধরনের সুযোগ হিসেবে দেখছে বিভিন্ন দেশের বেসরকারি ডাটা কোম্পানি। স্যাটেলাইট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল ও ভূতাত্ত্বিক তথ্য ব্যবহার করে বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি বিশ্লেষণে এগিয়ে আসছে এসব কোম্পানি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ডাটা পরিষেবা সংকুচিত হওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে উদ্বেগ বাড়ছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে সাধারণত সরকারি তথ্যকেই নির্ভুল ধরা হয়। একই সঙ্গে এতে সবার সমান প্রবেশাধিকারও থাকে। খবর রয়টার্স।
বৈশ্বিক রিয়েল এস্টেট খাতে বন্যা, অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য জলবায়ু-সম্পর্কিত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ অবস্থায় তথ্য বিশ্লেষণে লন্ডনভিত্তিক ডাটা অ্যানালিটিকস কোম্পানি ক্লাইমেট এক্সকে দায়িত্ব দিয়েছে ব্রিটিশ রিয়েল এস্টেট ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান সাভিলস ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট। সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণে এআই-ভিত্তিক ঝুঁকি মডেলিং টুল ব্যবহার করে ক্লাইমেট এক্স। এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক তথ্যের বড় একটি অংশ সংগ্রহ করা হয় সংশ্লিষ্ট মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে।
ইউরোপ ও এশিয়ায় ৩০০টি প্রকল্প রয়েছে সাভিলসের। কোম্পানিটি সম্মিলিতভাবে ২ হাজার ৯৯৩ কোটি ডলার মূল্যের সম্পদ তত্ত্বাবধান করে। এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে কোম্পানিসংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর জলবায়ুবিষয়ক বৈজ্ঞানিক পরিষেবা খাতে বরাদ্দ কমাতে শুরু করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমন এক সময় তিনি এ সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন শুরু করেন, যখন জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে পরিবেশগত তথ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এ অবস্থায় ক্লাইমেট এক্সসহ বিভিন্ন দেশের বেসরকারি ডাটা কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারা এখন খরা বা দূষণঝুঁকি থেকে শুরু করে অনাবিষ্কৃত খনিজ সম্পদের অবস্থান পর্যন্ত ব্যাপক পরিসরে তথ্য সরবরাহ করছে।
বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান গার্টনার বলছে, আর্থ ইন্টেলিজেন্স খাতে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর আয় ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশ বেড়ে ৪২০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসায় পরিবেশগত ঝুঁকি হ্রাস, নতুন সুযোগ তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থ ইন্টেলিজেন্স খাতের প্রভাব সামনের দিনগুলোয় আরো বাড়তে যাচ্ছে। এখন এ খাতের বৈশ্বিক আকার ২৬ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। ২০৩০ সাল নাগাদ খাতটি মোট ৩ লাখ ৮০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করবে।
তবে আবহাওয়া-সংক্রান্ত তথ্য পরিষেবায় বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে তথ্যের নির্ভুলতা ও যারা এতদিন বিনামূল্যে এসব তথ্য পেতেন, তাদের সামর্থ্য নিয়ে উদ্বেগ ফুটে উঠছে তাদের মন্তব্যে। ডজন খানেক আর্থ ইন্টেলিজেন্স কোম্পানির মন্তব্যেও সরকারি তথ্যের নির্ভুলতার বিষয়টা উঠে এসেছে। তারা বলছেন, ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) মতো মার্কিন সরকারি সংস্থার তথ্য ছাড়া বেসরকারি কোম্পানিগুলো খুব বেশি কিছু করতে পারে না।
ক্লাইমেট এক্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিওও কামিল ক্লুজা বলেন, ‘আমাদের মডেল ঠিকভাবে কাজ করে কিনা, সরকারি ডাটা না থাকলে সত্যি তা জানতেই পারতাম না।’
সরকারি পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মিথেন লিক বা বন্যার মানচিত্রের মতো তথ্য ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের কাছে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠবে। এ কারণে কোম্পানিগুলো এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জাপান ও যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিসের বিকল্প তথ্যের দিকে ঝুঁকছে। কামিল ক্লুজা বলেন, ‘আমরা অতীতের ঘটনা যাচাই করতে সরকারি ডাটার ওপর বড় আকারে নির্ভর করি।’
গার্টনারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক ডাটা পরিষেবা খাতে মোট ব্যয়ে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর হিস্যা শিগগিরই অর্ধেকের বেশিতে দাঁড়াতে যাচ্ছে। বর্তমানে এ খাতে বিনিয়োগে কোম্পানিগুলোর হিস্যা মাত্র ১৫ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থ ইন্টেলিজেন্স কোম্পানির জন্য পুঁজি জোগাড় করা আগে কখনই এত সহজ ছিল না।
চলতি বছরে ৫৭টি ফান্ডিং রাউন্ডে মোট ৩২০ কোটি ডলার বিনিয়াগ জোগাড় করেছে আর্থ ইন্টেলিজেন্স কোম্পানিগুলো। গত বছর ৮৯ রাউন্ডে সংগ্রহ হয়েছিল ১১০ কোটি ডলার। ২০২৩ সালের ৯৯টি রাউন্ডে উঠেছিল ৮৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিথেন ডাটা সরবরাহকারী কানাডার মন্ট্রিয়লভিত্তিক জিএইচজিস্যাট। গত সেপ্টেম্বরের একটি রাউন্ডে কোম্পানিটি ৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছে। কোম্পানিটি এখন পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা ১৩টি স্যাটেলাইটের সঙ্গে আরো দুটি যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে।
ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৩ সালে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ বা বিজ্ঞান-সংক্রান্ত বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের সংখ্যা ছিল ৬৬৬, যেখানে ২০০৫ সালে ছিল সাতটি।
শেয়ারবাজারেও সম্প্রতি আর্থ ইন্টেলিজেন্স কোম্পানিগুলোর বড় ধরনের উত্থান দেখা যাচ্ছে। খাতটির শীর্ষ কোম্পানি প্লানেট ল্যাবসের শেয়ারদর চলতি বছর ১৯০ শতাংশ বেড়েছে।
ডাচ জিওস্পেশাল ডাটা কোম্পানি ফুগ্রোর বার্ষিক আয় এখন ২২০ কোটি ডলারের বেশি। কোম্পানিটি এখন সমুদ্রভিত্তিক ডাটা পরিষেবাও বিস্তৃত করেছে। তবে আর্থ ইন্টেলিজেন্স খাতও অর্থনৈতিক অস্থিরতার বাইরে নয়। ২০২৪ সালে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও চলতি বছর বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে ফুগ্রো। এর আংশিক কারণ হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ট্রাম্প প্রশাসন সহায়তা কমিয়ে দিলে অফশোর বায়ু টারবাইন গ্রাহকরা ঝুঁকিতে পড়ে যান। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ফুগ্রোর আয় কমেছে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ।