মূলত ডিজিটাল লেনদেন জনপ্রিয় করতে এবং অর্থনীতিকে ক্যাশলেস বা নগদবিহীন করার লক্ষ্যেই নেয়া হয়েছে এ পদক্ষেপ। ফলে এখন থেকে গ্রাহক যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহার করে একটি মাত্র কিউআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে পেমেন্ট করতে পারেন। এর অংশ হিসেবে বাংলা কিউআর সেবাকে জনপ্রিয় করতে নানামুখী উদ্যোগও নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ভূমিকা কী, তা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন।
বাংলা কিউআর কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংক কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে?
দেশের বৃহৎ ব্যাংক হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যেকোনো নীতি উদ্যোগ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে আমরা সবসময় অগ্রণী ভূমিকা রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলা কিউআরের ক্ষেত্রেও সে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এর সফল বাস্তবায়নে আমরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছি। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সংযুক্তি, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন ও সাইবার নিরাপত্তার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। আমাদের মার্চেন্টদের জন্য আগে থেকেই চালু থাকা কিউআর ব্যবস্থার একটি বড় অংশে বাংলা কিউআর সমন্বিত ছিল। ফলে নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তর সহজ ও দ্রুত হয়েছে। একই সঙ্গে মার্চেন্ট অনবোর্ডিং কার্যক্রম জোরদার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং গ্রাহকদের মধ্যে বাংলা কিউআর ব্যবহারের সুবিধা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছি। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ২০২৫ সালে বাংলা কিউআর জনপ্রিয়করণ কর্মসূচি শুরু হলে, তাতে ইসলামী বাংক একাধিক জেলায় লিড ব্যাংক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। পাশাপাশি অন্যান্য ব্যাংকের নেতৃত্বে আয়োজিত কর্মসূচিতেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে জাতীয় এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে। আমাদের লক্ষ্য দেশজুড়ে একটি নিরবচ্ছিন্ন, নিরাপদ ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য (ইন্টারঅপারেবল) ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম তৈরি করা। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) অ্যাপ ব্যবহার করে সহজে, দ্রুত ও নিরাপদে লেনদেন করতে পারবেন।
ক্যাশলেস অর্থনীতির অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত করতে ব্যাংকগুলোর করণীয় কী বলে আপনি মনে করেন?
ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে ব্যাংকগুলোকে নিরাপদ, সহজলভ্য ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবনী সেবা সম্প্রসারণে আরো সক্রিয় হতে হবে। পাশাপাশি গ্রাহকের চাহিদাভিত্তিক উদ্ভাবনী সেবা সম্প্রসারণ, মার্চেন্ট নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা, মানুষের ডিজিটাল আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং সাইবার নিরাপত্তা আরো জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি মানুষের আস্থা আরো শক্তিশালী করতে হবে। আমি মনে করি, এসব উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ক্যাশলেস অর্থনীতির ভিত্তি আরো সুদৃঢ় হবে এবং বাংলাদেশে একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
ডিজিটাল লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যবহার বাড়াতে ইসলামী ব্যাংক কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
তিন কোটিরও বেশি গ্রাহকের আস্থা, দেশের অন্যতম বৃহৎ শাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এবং শক্তিশালী ডিজিটাল ব্যাংকিং অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে আমরা ডিজিটাল লেনদেনের প্রসারে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছি। বহুমুখী কার্ড ও এটিএম সেবা, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এমএফএস, বাংলা কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট এবং বিস্তৃত মার্চেন্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকের জন্য সহজ, নিরাপদ ও তাৎক্ষণিক লেনদেন নিশ্চিত করা হচ্ছে। আগামীতেও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহার, সেবার পরিধি সম্প্রসারণ এবং গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার আরো বাড়াতে চাই। একই সঙ্গে দেশের ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার জাতীয় উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা কিউআরের ব্যবহার সম্প্রসারণে প্রধান চ্যালেঞ্জ কী বলে আপনি মনে করেন?
বাংলা কিউআরের বিস্তারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ডিজিটাল আর্থিক সাক্ষরতার ঘাটতি, প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভিজ্ঞতা ও নগদ লেনদেনের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে এখনো ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। এছাড়া কিছু এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ ও স্মার্ট ডিভাইসের সীমাবদ্ধতাও একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ও ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম অপরিহার্য।
বাংলা কিউআর নগদনির্ভর লেনদেন কমাতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে?
বাংলা কিউআর তাৎক্ষণিকভাবে নগদ লেনদেনের বিকল্প হয়ে উঠবে না, তবে এটি নগদনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে। বিশেষত খুচরা কেনাকাটা, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দৈনন্দিন লেনদেনে এর ব্যবহার বাড়লে ডিজিটাল পেমেন্টের পরিধি দ্রুত সম্প্রসারণ হবে। ব্যাংক, ব্যবসায়ী ও গ্রাহকের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলা কিউআর ভবিষ্যতে একটি ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠবে।
ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার কীভাবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে?
ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরো স্বচ্ছ, অনুসরণযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক হবে, যা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে নগদনির্ভরতা কমে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন কমবে। ফলে করের আওতা সম্প্রসারণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং অর্থ পাচার ও কর ফাঁকির ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তি আরো শক্তিশালী করবে।
ডিজিটাল পেমেন্ট সেবার নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ইসলামী ব্যাংক কী ধরনের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে?
ডিজিটাল লেনদেনের প্রসারের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ব্যাংকগুলোর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা প্রযুক্তি, রিয়েল টাইম লেনদেন পর্যবেক্ষণ, বহুমাত্রিক গ্রাহক শনাক্তকরণ, জালিয়াতি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট জোরদার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরো শক্তিশালী করা হচ্ছে, যাতে ডিজিটাল লেনদেন নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য থাকে।
ডিজিটাল পেমেন্টকে সর্বজনীন ও সহজলভ্য করতে এমএফএস, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং বাংলা কিউআরের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই?
এমএফএস, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং বাংলা কিউআরের কার্যকর সমন্বয়ই একটি একীভূত ও ইন্টারঅপারেবল ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার মূল ভিত্তি। এর মাধ্যমে গ্রাহক যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট থেকে একই বাংলা কিউআর ব্যবহার করে সহজ, দ্রুত ও নিরাপদে লেনদেন করতে পারবেন। এ ধরনের সমন্বয় গ্রাহকের অভিজ্ঞতাকে যেমন আরো উন্নত করবে, তেমনি ব্যবসায়ীদের জন্যও ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ সহজ করবে। এভাবেই ক্যাশলেস অর্থনীতির বিকাশ ত্বরান্বিত এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরো শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম আগামী পাঁচ বছরে কী ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাবে?
আগামী পাঁচ বছরে আমরা বাংলাদেশকে একটি সমন্বিত, আন্তঃপরিচালনযোগ্য ও ক্যাশলেস ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম হিসেবে দেখতে চাই, যেখানে ডিজিটাল লেনদেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হবে। তিন কোটিরও বেশি গ্রাহক, দেশের অন্যতম বৃহৎ শাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এবং শক্তিশালী ডিজিটাল ব্যাংকিং সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এ রূপান্তরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য নিরাপদ, উদ্ভাবনী ও সর্বজনীন ডিজিটাল আর্থিক সেবার মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করা।