রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ কর্তৃক আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘নির্ভরতা থেকে সার্বভৌমত্ব: বাংলাদেশে ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগের রোডম্যাপ’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য ও সঞ্চালনা করেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন খান।
গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের জ্বালানি খাতের ৬০ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে ‘জিরো-অ্যারেবল ল্যান্ড’ বা কৃষিজমি রক্ষা কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে ২০৪০ সালের জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত কি-নোট পেপারে ২০৪০ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের একটি রোডম্যাপ তুলে ধরা হয়। গবেষণা অনুযায়ী, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন বৃহৎ শিল্পাঞ্চলে কারখানার ছাদে প্রায় চার কোটি বর্গফুট জায়গা রয়েছে। এসব ছাদ সোলার প্যানেলের আওতায় আনলে প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এটি কারখানার নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে জাতীয় গ্রিডেও অবদান রাখবে।
দেশের অভ্যন্তরীণ বড় জলাশয়, বিশেষ করে কাপ্তাই হ্রদের মাত্র ১ শতাংশ এলাকা ও মাছ চাষের ঘেরগুলোকে ব্যবহার করে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এতে জমি সাশ্রয়ের পাশাপাশি পানির বাষ্পীভবন কমবে এবং মৎস্য চাষের অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকবে। এছাড়া বর্তমানে দেশে থাকা প্রায় ১৩ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্পকে সৌরশক্তিতে রূপান্তর করলে আরো প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হবে। এটি কৃষিজমিতে অতিরিক্ত প্যানেল না বসিয়েই সেচকাজের পাশাপাশি গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ তৈরি করবে। এ কৌশলের মাধ্যমে দেশের প্রায় ৬০ হাজার একরের বেশি আবাদি জমি স্থায়ীভাবে রক্ষা করা সম্ভব হবে। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত না করেই বাংলাদেশ জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারবে।
গোলটেবিল বৈঠকে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান বলেন, ‘অসহনীয় ঋণের ওপর দাঁড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব অর্জন সম্ভব নয়। বর্তমান জ্বালানি সংকট আমাদের জন্য শেষ সতর্কবার্তা। এখন ঋণের বোঝা এড়িয়ে প্রাকৃতিক ও স্মার্ট নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগোতে হবে।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, ‘বর্তমানে যে সেন্ট্রালাইজড গ্রিড সিস্টেম চলছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই ইনেফিশিয়েন্ট। আমার প্রস্তাব, এখন ডিস্ট্রিবিউটেড সোলার সিস্টেমে চলে যাওয়া উচিত।’
দেশের ৬৮ হাজার গ্রামে ছোট ছোট সোলার পাওয়ার প্লান্ট তৈরি করে দিলে পিডিপি শুধু ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর ও মেট্রোপলিটন সিটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহে মনোযোগ দিতে পারবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, ‘জ্বালানি খাত এখন ওভার রেগুলেটেড বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত। এখানে অনেক সংস্থা যার যার মতো নিয়ম দিচ্ছে। আমাদের উচিত এনজিওগুলোকে ব্যবসায়িক মডেলে অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে তারা ব্যাংক অর্থায়নের মাধ্যমে গ্রামগুলোকে আলোকিত করতে পারে।’